ফেনীতে কেন অতিবৃষ্টি?

  • ৭২ ঘণ্টায় ফেনীতে ৫৬৮, কক্সবাজারে ৪৫৭, মাইজদিতে ৪২১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে 
আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৫, ১২:৩৬ পিএম

দেশের বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত ও বন্যার প্রকৃতিতে পরিবর্তনের আভাস মিলছে সাম্প্রতিক সময়ে। সাধারণত এই সময়ে মধ্যাঞ্চলে প্লাবন দেখা গেলেও এবার টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফেনী ও আশপাশের জেলা। গত বছরও জুলাই মাসে একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল ফেনী ও নোয়াখালীতে। চলতি সপ্তাহে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে ফেনীতে।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত শেষ ৭২ ঘণ্টায় ফেনীতে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৫৬৮ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ৪৫৭ এবং নোয়াখালীর মাইজদিতে ৪২১ মিলিমিটার। একইসঙ্গে টানা বৃষ্টির মুখে পড়েছে বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সীতাকুণ্ড, রাঙ্গামাটি, সন্দ্বীপ, চাঁদপুর ও কুমিল্লাও।

কেন এত বৃষ্টি ফেনীতে?

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, ‘শুধু ফেনী নয়, মাসের শুরু থেকেই কক্সবাজার, চট্টগ্রাম হয়ে ফেনীতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে ভারী বর্ষণ। অর্থাৎ ফেনীতে একনাগাড়ে দু’দিনের বেশি ভারী বৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, বঙ্গোপসাগরের একটি লঘুচাপ স্থলভাগে উঠে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, যশোর ও কুষ্টিয়ায় অবস্থান করছে। উত্তর গোলার্ধে বাতাস ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ঘোরে, ফলে লঘুচাপের ডান পাশে অবস্থিত অঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। সেই ডান পাশে পড়ছে ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। লঘুচাপটি যখন ধীরে কক্সবাজার থেকে উত্তরের দিকে অগ্রসর হয়, তখন বৃষ্টির রেখাও সেই পথেই এগোয়। কিন্তু যশোর-কুষ্টিয়ায় গিয়ে লঘুচাপ স্থির হয়ে যাওয়ায় ভারী বর্ষণ গিয়ে থেমেছে ফেনীতে। ফলে ওই অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে।

বৃষ্টি কি কমবে?

এ প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, ‘লঘুচাপটি এখন ঝাড়খণ্ডের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে আজ বৃহস্পতিবার থেকেই দেশের বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসবে।’

পূর্বাঞ্চলে বর্ষণ, বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেল মধ্যাঞ্চল

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদের ভাষ্যে, পূর্বাঞ্চলে ভারী বর্ষণের ফলে দেশের মধ্যাঞ্চল এবারের মতো প্লাবনের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই বৃষ্টিপাত যদি উত্তরাঞ্চলে হতো, তাহলে তা দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় পরিণত হতো। কিন্তু পূর্বাঞ্চলে হওয়ায় পাহাড়ি ঢাল বেয়ে পানি দ্রুত সাগরে পড়ে যাচ্ছে।’

এই বিশ্লেষণকে সমর্থন করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের মুখপাত্র ও নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, ‘ফেনী ও নোয়াখালীতে অতিবৃষ্টি এবং উজানে ভারী বর্ষণের কারণে মুহুরী ও সেলুনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে, ফলে বন্যা দেখা দিয়েছে।’

কেন পূর্বাঞ্চলে বেশি বৃষ্টি?

ভূগোলবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্ষার এ সময়ে সমুদ্র থেকে আসা আর্দ্র বায়ু দেশের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায়। সেখানেই ঘনীভূত হয়ে তা বৃষ্টি হয়ে নিচে পড়ে।

বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে আসা জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু সরাসরি পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ে ধাক্কা খায়। ফলে ওই এলাকায় যেমন ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও সিলেটে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাহাড়ে বৃষ্টি হলে পানি দ্রুত নিচে নামে এবং বন্যা সৃষ্টি করে। আবার সেই পানি দ্রুত সাগরেও চলে যায়। ফেনীর ক্ষেত্রে আমরা সেই প্রবাহই দেখতে পাচ্ছি।’

সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবও রয়েছে

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা কাজী জেবুন্নেছা বলেন, ‘লঘুচাপের পাশাপাশি সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ক’দিন ধরে দেশের পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তবে আজ থেকে এই প্রবণতা অনেকটা কমে যাবে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবানে বৃষ্টিপাত হয়েছে ২৭১ মিলিমিটার। নোয়াখালীর মাইজদিতে ২০২, চট্টগ্রামে ১৬৯, কক্সবাজারে ১৪১ এবং ফেনীতে ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত