শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠান ৫ বছরে বেড়েছে সাত গুণ

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৫, ০৮:৪৪ পিএম

চলতি বছরের এএসসি পরীক্ষার ফলে ব্যাপক ধস নেমেছে। গত বছরের তুলনায় পাসের হার ১৪.৫৯ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে দেশের ১৩৪টি স্কুলে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এসব স্কুল থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাশ করেনি। কর্তৃপক্ষ বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার ফলাফল বেশি দেখাত। এতে শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি ঘটেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ১৮টি। পরবর্তী বছরগুলোতে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে ২০২২ সালে ৫০, ২০২৩-এ ৪৮, ২০২৪-এ ৫১, আর এবার বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৪-এ।

২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ১৩৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনও পরীক্ষার্থী পাস করেনি। গত বছর (২০২৪) শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান ছিল ৫১টি। এ বছর পাস না করা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৮৩টি। চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। 

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবছর মোট ১৯ লাখ ২৮ হাজার পরীক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। এবার পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩৯০৩২ জন।

এ বছর মোট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৩০ হাজার ৮৮টি। মোট ৩ হাজার ৭১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আর ২০২৪ সালে মোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ২৯ হাজার ৮৬১টি। মোট তিন হাজার ৭৯৯টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।   

এসএসসি পরীক্ষায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ১৩টি বিদ্যালয়ের কেউই পাস করতে পারেনি। এসএসসি পরীক্ষায় ১৩টি বিদ্যালয় থেকে ৯৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। এই ব্যর্থতা কেবল দুর্গম, সুবিধাবঞ্চিত এলাকার নয়। উপজেলা সদরের বহু প্রতিষ্ঠানে এবার ফল বিপর্যয়। 

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় ১৭টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাস করেছে। এর আগের বছর ২২২টি বিদ্যালয়ে শতভাগ পাস করেছিল। তবে এবার ১৬টি বিদ্যালয়ের কোন পরীক্ষার্থী পাস করেনি।

দেশের বিভিন্ন জেলার অনেক শিক্ষার্থীই বলছে, পাঠদানের জন্য এখন আর স্কুলই নির্ভরযোগ্য জায়গা নয়। স্কুলে পাঠদান হয় দায়সারা ভাবে, আবার বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাদই পড়ে যায়। একাধিক প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, গণিত, ইংরেজি, পদার্থ, হিসাববিজ্ঞান এই ধরনের বিষয়গুলোতে শিক্ষক না থাকায় স্কুলগুলোতে সঠিকভাবে ক্লাস নেওয়া যায় না। কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর ধরে শিক্ষক পদ ফাঁকা। কোনো কোনো স্কুলে একজন শিক্ষক একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ক্লাসের মান যেমন পড়ে যাচ্ছে, তেমনই শিক্ষার্থীরা নিজে থেকেই স্কুল বিমুখ হয়ে যাচ্ছে।

জগন্নাথপুর হাইস্কুলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্যাররা ঠিকভাবে ক্লাস নেন না। বলেন, কোচিংয়ে পড়লে বোঝা যাবে। আমি কোচিং করতে পারিনি, তাই ফেল করেছি।’

রংপুর বিভাগের দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে ১৩টি বিদ্যালয় থেকে কেউ পাস করেনি। এই ১৩ বিদ্যালয়ে মোট পরীক্ষার্থী ৯৮ জন। যেসব বিদ্যালয় বারবার ফেল করছে, সেসব স্কুলে খুব একটা জবাবদিহিতা নেই। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত স্বাধীনভাবে চলে, যার ফলে বছরের শেষে ফলাফলে ধস নামে। ঢাকার বাইরে বেশ কিছু জেলায় এমন স্কুল আছে যেখানে তিন বছর ধরে শতভাগ ফেল হচ্ছে, অথচ প্রধান শিক্ষক বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। 

দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. তৌহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, এবার সব বোর্ডের ফলাফল খারাপ। এরপরও এই বিষয়টি যাচাই করে দেখা হচ্ছে। আর যেসব বিদ্যালয় থেকে কেউই পাস করতে পারেনি সেসব বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শিক্ষকদের অনেকেই নিজেদের দায় এড়াতে বলেন শিক্ষার্থীরাই আগ্রহী নয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্কুলের শ্রেণিকক্ষের বাইরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল কোচিং সংস্কৃতি। শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষকের কাছে শুধু কোচিংয়ে মনোযোগ পায়। সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও কোচিং বেশ এগিয়ে। 

বালিয়াকান্দি সরকারী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় উপজেলা সদরের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটিতে পাস করেছে ৭৪ জন, ফেল ১৯ জন, এর মধ্যে জিপিএ ৫ মাত্র ৭ জন। এতে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোর সন্তানেরা শিক্ষা থেকে একরকম ঝরে পড়ছে। একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্কুলে ক্লাস হয় না, আর কোচিং না করলে কেউ পাশ করে না। সব স্যারেরা বলেন, বাইরে এসে পড়লে বুঝবে।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলভিত্তিক পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের আলাদা ক্লাস চালু করা এবং কোচিং নির্ভরতা কমানোরও পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।

ফলাফল বিপর্যয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন অভিভাবক ফোরাম। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এস এস সি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়ে গভীর উদ্বেগ, হতাশা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন ও ফলাফল বিপর্যয়ের মূল কারণ উন্মোচন করে শিক্ষার মান উন্নয়নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। 

বিবৃতিতে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, গত বছরে তুলনায় এ বছর শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে এবং ৪৩ হাজারেরও বেশী পরীক্ষার্থী জিপিএ ৫ পায়নি। এতে প্রমাণিত হয়েছে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করে দলীয় রাজনীতি, ব্যক্তিস্বার্থে শিক্ষাকে বাণিজ্যে রুপদান ও কোচিং বাণিজ্যকে সম্প্রসারণ করেছে। আর বিগত ১৬ বছর ধারাবাহিকভাবে শিক্ষাকে ধ্বংস করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পরীক্ষার খাতায় বেশী নম্বর দিয়ে জিপিএ ৫ বেশী দেখিয়েছে। এর দায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষাবোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়িয়ে যেতে পারেনা। তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানানো হয়। সরকারকে ধ্বংসের হাত থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করার অনুরোধ জানান অভিভাবক ফোরাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত