আলী রীয়াজ

প্রধান বিচারপতি নিয়োগে দুই বিষয়ে একমত দলগুলো

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৫, ০৩:৪৯ এএম

প্রধান বিচারপতি নিয়োগ-সংক্রান্ত দুটি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের ১১তম দিনের আলোচনা শেষে তিনি এ কথা বলেন।

আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করবেন। বিদ্যমান সংবিধানে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রধান বিচারপতি হিসেবে কর্মে নিযুক্ত জ্যেষ্ঠতম একজনকে না করে জ্যেষ্ঠ দুজনের মধ্যে একজন নিয়োগ করা হবে সে বিষয়ে দুটি মত উপস্থিত আছে। কমিশন এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ সময় কমিশনের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, জরুরি অবস্থা ঘোষণা-সংক্রান্ত বিষয়ে গত ৭ জুলাইয়ের আলোচনায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪১(ক) সংশোধন এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা যেন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার না হয় এ দুটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। আজকের আলোচনায় অনুচ্ছেদ ১৪১(ক) সংশোধনের ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগের’ জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান অপসারণ এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি স্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের বিধান যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে এ বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আরও কী কী বিষয় সংযুক্ত করা যায়, সেসব আগামী সপ্তাহের আলোচনায় সুস্পষ্ট হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক দুটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে কমিশনের সহসভাপতি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দল এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা কার্যত যতদূর সম্ভব ত্রুটিহীন হয় এবং যে ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান আন্দোলন-সংগ্রামের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে। এ বিষয়েও আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

একটি দলের প্রস্তাবে ঘোষণাপত্র নিয়ে মধ্যস্থতা করছে সরকার : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবে জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে সরকার মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব নিয়েছে। এ বিষয়ে আমরা এখনই সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাই না। তবে আমরা ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করতে চাই। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে চাই। এ বিষয়ে সরকারকে লিখিত প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছে।’

গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের ১১ দিনের সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

সালাহউদ্দিন বলেন, ‘স্বাধীনতার পর জনপ্রতিনিধিরা ঘোষণাপত্র তৈরি করেছিলেন, তারা আলোচনা করে সংবিধান প্রণয়ন করেন। তবে পরবর্তী সময়ে ঘোষণাপত্রকে সংবিধানে সংযুক্ত করা হয়নি।’ তিনি মনে করেন, ঘোষণাপত্রের রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকার বিধান নেই।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গ : প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জ্যেষ্ঠ দুজনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পক্ষে বিএনপি। তবে এ বিষয়ে পুরোপুরি ঐকমত্য তৈরি হয়নি।’

‘জরুরি অবস্থা’ ইস্যু : জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে ‘প্রধানমন্ত্রীর’ পরিবর্তে ‘মন্ত্রিপরিষদের’ অনুমোদন নেওয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ক্ষুণœ করা যাবে না, সে বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসেবে রাখতে চাই আমরা। আর এই আইন যাতে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে সবাই একমত। তবে কোন প্রক্রিয়ায় কারা সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে।’

এ ছাড়া জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’ শব্দের পরিবর্তে ‘বিলুপ্তির প্রস্তাবে’ বিএনপি একমত বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ।

সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলার বিষয়টি জরুরি অবস্থা জারির আওতায় আনার প্রস্তাব এবি পার্টির : সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগটি একটি নীতিমালার মধ্য দিয়ে হওয়া দরকার বলে মনে করে এবি পার্টি। সেই সঙ্গে পুরো বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াটি মেধার ভিত্তিতে হওয়ার কথা বলেছি, কোনো দলীয় বিবেচনায় যাতে এমন স্পর্শকাতর নিয়োগ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।

রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের ১১তম অধিবেশনে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার সানী আবদুল হক। পরে ব্রিফিংয়ে ব্যারিস্টার ফুয়াদ জানান, আজকে (গতকাল) তত্ত্বাবধায়ক সরকার, জরুরি অবস্থা জারি, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে সংযুক্তের বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলই ঐকমত্য পোষণ করেছে। অন্যদিকে কমিশনের পক্ষ থেকে দুজন সিনিয়র বিচারপতির প্যানেল থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে, এখানে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই একমত পোষণ করেছে, তবে এই প্যানেলের প্রয়োগ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত