ইংরেজি-গণিতের পিছুটানে পাসের হারে ভাটা

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৫, ০৪:০৭ এএম

ইংরেজি ও গণিতে যে বছর পাসের হার বেশি থাকবে, সে বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হারও বেশি থাকবে। এই অলিখিত নিয়মই স্বাভাবিক নিয়মে রূপ নিয়েছে। ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ, সে বছর বোর্ডের গড় পাসের হার নেমে এসেছিল ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশে। এবার গণিতে ৮১ দশমিক ৫৩ শতাংশ ও ইংরেজিতে ৮৩ দশমিক ২৪ শতাংশ পাস করায় বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার কমে ৭২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে গত বছর গণিতে ৯২ শতাংশ ও ইংরেজিতে ৯৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ পাস করায় বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার উঠেছিল ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশে।

পাঠ্যক্রমের এ দুই বিষয়ের পাস-ফেলের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান কোথায়। শহরের মধ্যে হলে পাসের হারে একধরনের চিত্র এবং শহর থেকে যত দূরে হবে পাসের হারেও দূরত্ব বাড়বে। প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার ৭২ দশমিক ০৭, কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের পাসের হার ৮১ দশমিক ০৩। এখন প্রশ্ন হলো, শহরের পাসের হার যদি ৮১ দশমিক ০৩ হয়, তাহলে গড় পাসের হার কমল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার ইংরেজি ও গণিতে পাসের হার কমেছে। আর তাই বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার কমেছে।

কিন্তু ইংরেজি ও গণিতে কম পাস করলেও শহরে তো পাসের হার কমেনি। বোর্ডের পাসের হার কমল কেন? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, শহরের তুলনায় গ্রামের ও তিন পার্বত্য জেলার শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে বেশি ফেল করেছে। আর এরই প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ফলাফলে।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের এ বক্তব্য আরও জোরালো করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইলিয়াস উদ্দিন আহামদ বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরে যেখানে পাসের হার ৮১ দশমিক ০৩, মহানগরের বাইরে গ্রামাঞ্চলে পাসের হার ৭১ দশমিক ২৯ শতাংশ। আবার একটু দূরে কক্সবাজারে পাসের হার আরও কমে ৭০ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমেছে। কক্সবাজার থেকে পাহাড়ের দিকে গেলে পাসের হার আরও কমে বান্দরবানে ৬৩ দশমিক ১২, খাগড়াছড়িতে ৬০ দশমিক ৭৭ ও রাঙ্গামাটিতে ৫৬ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমেছে।

পাসের হার এভাবে নেমে যাওয়ার কারণ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইংরেজি ও গণিতে চট্টগ্রাম শহরের বাইরের স্কুলগুলোতে তেমন দক্ষ শিক্ষক নেই। শুধু দক্ষ শিক্ষকই নয়, সমতল থেকে এসব এলাকা পিছিয়ে থাকায় বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হারে ভাটার টান দেখা যায়।

শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের এ বক্তব্যের সঙ্গে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা গবেষণা নিয়ে কাজ করা ড. সামসুদ্দিন শিশির। চট্টগ্রাম সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘আমরা সবসময় বলি পাহাড়ের কারণে বোর্ডের ফল পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা কি পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের সামনের দিকে এগিয়ে আনতে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছি? আমাদের কি কোনো গবেষণা রয়েছে এ বিষয়ে?’

তিনি আরও বলেন, ‘বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিকের নম্বরের প্রভাবে জিপিএ ৫ পেয়ে থাকে। প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক ক্লাস হয় না বললেই চলে। তাই পাসের হার নয়, আমাদের শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে।’

সামসুদ্দিন শিশিরের এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, এবারের প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ১ হাজার ১৬৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৮৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১১ হাজার ৮৪৩ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা পেয়েছে ১০ হাজার ৪৫৮, মানবিকের ১৩৮ ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ১ হাজার ২৪৭ জন। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ তজল্লি আজাদ বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে দক্ষ শিক্ষকের যেমন অভাব রয়েছে তেমনি শিক্ষকদের অবহেলাও রয়েছে। ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ প্রশাসক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো যেতে পারে।’

একই মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম মহানগরীর অন্য সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহেদা আক্তার। তিনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলের শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে পাহাড় নিয়েও পরিকল্পনা প্রয়োজন।’

পাহাড়ের বাস্তব চিত্র জানতে কথা হয় রাঙ্গামাটির বরকল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রভাতবিন্দু চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক দূর-দূরান্তে ভালো শিক্ষক রয়েছেন। তবে ভালো শিক্ষকরা অবসরে যাওয়ার পর নতুন শিক্ষকে কিছু ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি পূরণ করতে হবে। কিন্তু এখন আর্থসামাজিক অবস্থা খারাপ বিধায় শিক্ষার দিকে কারও নজর নেই। তাদের কাছে সার্টিফিকেট মুখ্য।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত