কেজিডিসিএল-সিবিএ দুই পক্ষ মুখোমুখি, সংঘাতের আশঙ্কা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৫, ০৩:৫১ পিএম

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) শ্রমিক-কর্মচারীদের যৌথ দর কষাকষির প্রতিনিধি সংগঠন সিবিএর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি এই সংস্থায় কর্তৃত্ব নিয়ে শ্রমিক লীগ থেকে রাতারাতি শ্রমিক দল নেতা বনে যাওয়া কর্মচারী শরিফুলের নেতৃত্বে থাকা সংগঠন এবং একই সংস্থায় জাতীয় শ্রমিক দলের অর্ন্তভুক্ত দাবিদার আরেকটি সংগঠনের মধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেকোনও সময় দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। বিরাজমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কথা দেশ রূপান্তরের কাছে স্বীকারও করেছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।

অভিযোগ আছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাতারাতি শ্রমিক লীগ থেকে শ্রমিক দল নেতা বনে যাওয়া শরীফুল ইসলাম সংস্থায় নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে নানামুখী অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। মূলত সম্প্রতি কেজিডিসএল ভবনে শরীফুল নিজেদের সংগঠনকে জাতীয় শ্রমিক দলের অর্ন্তভুক্ত দাবি করে নিজের ছবি সম্বলিত ব্যানার ও পোস্টার সাঁটানোর পর দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলা বা শৃঙ্খলা রক্ষায় কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না।

বিষয়টি নজরে এলে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন জাতীয় শ্রমিক দল চট্টগ্রামের অন্যতম  কয়েকজন শীর্ষ নেতা। এরপর শরীফুলের ব্যানার ও পোস্টার তুলে ফেলে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ। কিছুদন ধরে ফের তৎপরতা শুরু করলে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষের কাছে শরীফুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে সংস্থায় বিদ্যমান জাতীয় শ্রমিক দলের মূল সংগঠন শ্রমিক-কর্মচারী সংসদ (২৫৮৩)। কিন্তু রহস্যজনক কারণে শরীফুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।

কেজিডিসিএল শ্রমিক-কর্মচারী সংসদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইকবালের অভিযোগ, রাতারাতি শ্রমিক দলের নেতা বনে যাওয়া শরীফুল ইসলাম ও তার সহযোগী মো. মহিউদ্দিন, মো. মুক্তা হোসেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর। রহস্যজনক কারণে কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যাপারে চরম উদাসীন। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দিন, চট্টগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর আর্শিবাদপুষ্ট এই শরীফুল দীর্ঘদিন ধরে কেজিডিসিএল থেকে অবৈধভাবে নানা সুবিধা ভোগ করছেন। মো. ইভবনের তৃতীয় তলার বড় একটি কক্ষ কথিত সিবিএ’র দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করছেন।’

কেজিডিসিএল শ্রমিক-কর্মচারী সংসদের (২৫৮৩) সভাপতি মুছা খালেদ বলেন, ‘শরীফুল অবৈধভাবে সরকারি সুবিধা ভোগ করছেন। সিবিএ’র অফিস হিসেবে কেজিডিসিএল ভবনে বিশাল আয়তনের কক্ষ ব্যবহারের পাশাপাশি সরকারি গাড়ি নিয়ে গোপনে শ্রমিক লীগের কর্মকান্ড চালাচ্ছেন। গত কয়েকদিন ধরে শরীফুল ও তার সহযোগীরা কেজিডিসিএল এ নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। ফলে যেকোনও সময় সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে এর দায়ভার কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) বেলা দুইটার দিকে কেজিডিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের দপ্তরে যান দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক। বিবদমান দুটি পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করার কথা স্বীকার করে সংস্থাটির শীর্ষ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘দাপ্তরিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সংযত থাকতে দু’পক্ষকে নোটিশ দিচ্ছি। দু’পক্ষের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে।’

এর আগে গত ২৪ মে রাতারাতি শ্রমিক লীগ থেকে শরীফুলের শ্রমিক দলের নেতা বনে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেছিলেন, এটা আমার কাছে বিব্রতকর একটা বিষয়। শরীফুল আগে করতেন শ্রমিক লীগ। এখন শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে সই করা কিছু কাগজপত্র নিয়ে এসেছেন।

শ্রমিক লীগের নেতা থেকে রাতারাতি শ্রমিক দলের নেতা বনে যাওয়া প্রসঙ্গে জাতীয় শ্রমিক দলের বিভাগীয় সভাপতি নাজিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শরীফুলের ব্যাপারে আমি জানি। কেজিডিসিএল সিবিএর মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর। পরের এক মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিষেধ করায় নির্বাচন আর হয়নি। সেখানে সিবিএর দুটি সংগঠন আছে। তবে আমরা কাউকেই স্বীকৃতি দিচ্ছি না। কর্তৃপক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিলে কোন পক্ষকে অনুমোদন দেওয়া হবে তখন সিদ্ধান্ত নেব।’

জানা গেছে, শরীফুল নিজেকে শ্রমিক দলের নেতা দাবি করলেও ২০২০ সালের ২৩ অক্টোবর জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কে এস আজম খসরু স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডে তাকে (শরীফুল) জাতীয় শ্রমিক লীগ, কেজিডিসিএল শাখা কার্যকরী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ, গেল বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরই খোলস পাল্টেছেন শরীফুল ইসলাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবিতে শরীফুলকে তার দলবল নিয়ে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী ও মহিউদ্দিন বাচ্চুকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে। এ ছাড়া শ্রমিক লীগের ব্যানারে নির্বাচনে জয়ী হওয়ায় ফেসবুকে নগর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন তাকে (শরীফুল ইসলাম) মিষ্টি খাইয়ে দিতেও দেখা গেছে।

এও জানা গেছে, শরীফুল ইসলাম সদ্য নিষিদ্ধঘোষিত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের ভাতিজা। তিনি কেজিডিসিএল-এ ‘দাদাভাই’ নামে পরিচিত। তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কেজিডিসিএল’ সিন্ডিকেট গঠন করে নিয়োগ, বদলি ও অবৈধ গ্যাস সংযোগ বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন কথিত এই ‘দাদাভাই’। ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজস্ব খাতের বিভিন্ন পদে ৯০ জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি নিজস্ব ওয়েবসাইট, স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ করে কেজিডিসিএল। নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করিয়ে প্ল্যান্ট অপারেটর পদে প্রার্থী মো. রুহুল আমীনকে পাস করানোর অভিযোগও আছে শরীফুলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে শরীফুল ইসলামের মোবাইলে বৃহস্পতিবার একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত