ফেনীর তিনটি উপজেলার বন্যাকবলিত হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে নতুন করে নেমেছে বেঁচে থাকার যুদ্ধে। বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও ঘরে ফিরে নতুন সংকটে পড়েছে দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা। কর্দমাক্ত ঘরবাড়ি, ভাঙাচোরা আসবাবপত্র আর পচে যাওয়া খাদ্যসামগ্রী নিয়ে শুরু হয়েছে বেঁচে থাকার নতুন লড়াই।
পানি নামলেও অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ নেই, অনেকেই এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর দিন পার করছে। এখনো ৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৩০টি পরিবারের ৪৮৪ জন রয়েছে। ইতিমধ্যে ৯ হাজার ৭৬ জন আশ্রয়কেন্দ্র ত্যাগ করে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করেছে।
ফুলগাজীর আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারিয়া ইসলাম বলেন, এখনো অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু হয়নি। পানি নামলেও অনেক ঘর বসবাসযোগ্য নয়। আমরা বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য বিভাগসহ সমন্বিতভাবে কাজ করছি।
গত সোমবার (৮ জুলাই) থেকে টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এতে ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার ১৩৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এর মধ্যে ১২১টি গ্রাম থেকে পানি নেমে গেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই বন্যায় ফেনী জেলায় কমপক্ষে দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে এবং এক হাজারের বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ফসল, সড়ক, সেতু ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। ফুলগাজী বাজারের শ্রীপুর সড়কে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ১৫টি দোকান। দোকান হারানো ব্যবসায়ীরা এখনো নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে খুঁজে ফিরছেন তাদের জীবিকার স্থান। স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আবদুল আলিম বলেন, ‘একদিনে দোকান গেল নদীতে। এত বছর দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালাতাম। এখন হাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। সংসারে একমাত্র আয় ছিল দোকানটি, এখন পুরো পরিবার নিয়ে চিন্তায় আছি।’
উপজেলার গজারিয়া গ্রামের গৃহবধূ রোজিনা আক্তার বলেন, ‘পানি নেমে গেছে, কিন্তু ঘরে ঢোকা যাচ্ছে না। মাটি, কাদা, পচা খাবারের গন্ধে শিশুদেরও অসুস্থ লাগছে। আশ্রয়কেন্দ্রেও এখন তেমন কিছু নেই।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, এবার মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে পরশুরামে ১৯টি ও ফুলগাজীতে ১৭টিসহ ৩৬টি স্থানে ভেঙেছে। এর আগে চার দিন ধরে ২০টি ভাঙনের তথ্য জানায় পাউবো।
পাউবো ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন বলেন, ‘মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধে আমরা জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করেছি। তবে টেকসই বাঁধ ও নদী খননের কাজ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। জেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, এবারের বন্যায় মৎস্য খাতে ৮ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কৃষিতে ৫ হাজার ৫৬৪ দশমিক ৬১ হেক্টর ফসলি জমি দুর্যোগে আক্রান্ত ও প্রাণিসম্পদে ৬৪ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুরোপুরি পানি নেমে যাওয়ার পরই ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ তুলে ধরা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা।
ফুলগাজীর কমুয়া এলাকার খামারি মো. হারুন বলেন, ‘গত বছরের বন্যায় অন্তত ২০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছিল। এবারও পানিতে ডুবে মুরগি মারা গেছে। মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। প্রতিবারই বাঁধ ভাঙে, পানি আসে, তারপর সবাই আশ্বাস দেয়। এসব এ জনপদে নিয়মে পরিণত হয়েছে।’
স্থানীয়রা বলছেন, ত্রাণ নয়, টেকসই বাঁধ চাই। বারবার এমন দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর তদারকি।
ফুলগাজীর সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুল রসুল গোলাপ বলেন, ‘ফুলগাজীর মানুষ এখন ত্রাণ চায় না, তারা চায় টেকসই বেড়িবাঁধ। নদীখনন, বাঁধের মেরামত আর সঠিক তদারকি না থাকলে আমরা প্রতিবছর ডুববো, এই বাস্তবতা এখন মানতেই হবে।’
গত শনিবার ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ার দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। স্থানীয়রা তাকে বলেন, ত্রাণ লাগবে না, শুধু বাঁধ দিন। তিনি বলেন, ‘দুটোরই দরকার। এখন মানুষকে বাঁচাতে হবে ত্রাণ দিয়ে, পরে জীবন ও জীবিকার জন্য লাগবে টেকসই বেড়িবাঁধ।’
পরশুরামের ইউএনও আরিফুল ইসলাম জানান, ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় অনেক কিছুই কম পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ফেনীর জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, জেলায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সাড়ে ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে শুকনো খাবার, গো-খাদ্য ও শিশু খাদ্যের আরও ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী ত্রাণ কার্যক্রমে প্রশাসনকে সহযোগিতা করছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এতে ২৯ জনের প্রাণহানি হয়। পানিবন্দি ছিল ১০ লাখের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাত। সেই বন্যায় প্রায় ২ হাজার ৬৮৬ কোটি ২০ লাখ ৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছিল।
নোয়াখালীতে পানি কমছে : টানা বৃষ্টিতে নোয়াখালীর ৫টি উপজেলায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় গত কয়েক দিন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছিল। তিন দিন বৃষ্টি না হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার পানি কমতে শুরু করলেও কিছু স্থানে এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। জনদুর্ভোগ কমাতে যৌথ বাহিনীর সহায়তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নোয়াখালী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আখিনূর জাহান নীলা জানান, সেনাবাহিনীর সহায়তায় সহকারী কমিশনার (ভূমি), নোয়াখালী সদরের নেতৃত্বে জলাবদ্ধতা নিরসনে উপজেলার ৯ নম্বর কালাদরপ ইউনিয়নের মুন্সীরতালুক থেকে ১ নম্বর চর মটুয়া ইউনিয়নের উদয় সাধুরহাট পর্যন্ত খালের ওপর অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনও যৌথ বাহিনীর সহায়তায় দখলকৃত নোয়াখালী খালের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে নোয়াখালী সদরের কয়েকটি স্থানে পানি কমলেও হরিনারায়ণপুর, উজ্জ্বলপুর, কাজী কলোনি, লক্ষ্মীনারায়ণপুর, কাদিরহানিফসহ নিচু এলাকাগুলোতে পানি জমে আছে। বিভিন্ন সড়ক খানাখন্দে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ভিড় কমলেও কবিরহাট উপজেলার ঘোষবাগ এলাকায় আশ্রয়ে রয়েছে কয়েকশ মানুষ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ত্রাণসামগ্রী ও বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা হয়েছে।
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে গতকাল বেলা ১১টায় মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে জামায়াতে ইসলামী। নোয়াখালী জেলা জামায়াত আমির এএসএম ইসহাক খন্দকার এতে নেতৃত্ব দেন।
নোয়াখালী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বেলাল আহমেদ খান জানান, পৌরসভার অধীনে থাকা যেসব রাস্তাগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় আমরা প্রথমে ড্রেন তৈরি করে স্থায়ীভাবে সড়ক মেরামতের উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। এতে বছর বছর সড়ক মেরামত করে টাকার অপচয় হবে না এবং জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে না।
বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ‘মনিটরিং সেল’ : কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চলে অতিবৃষ্টিসহ সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করেছে বিএনপি। গতকাল এই মনিটরিং ও তদারকি সেল গঠন করা হয় বলে দলের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক জেড খান মো. রিয়াজ উদ্দিন নসু স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রবিবার বিকেলে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য জাতীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চলে অতি বৃষ্টি ও দেশব্যাপী বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়।
সেলের সদস্যরা হলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আকরামুল হাসান মিন্টু, ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাইফ মাহমুদ জুয়েল। কমিটির সদস্যরা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
