রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবরে ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে কুপিয়ে ও গুলি করে দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। এ দুই থানায় প্রায়ই ঘটে হত্যা, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। রয়েছে কিশোর গ্যাংয়েরও ছড়াছড়ি। প্রতিনিয়ত পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর অভিযানে আসামি গ্রেপ্তার হলেও অপরাধ যেন কমছেই না।
গত বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টার দিকে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের নবোদয় হাউজিংয়ে পৃথক ঘটনায় একজনকে কুপিয়ে ও একজনকে গুলি করে হত্যা করছে দুর্বৃত্তরা। পৃথক দুই থানায় মামলা হলেও নতুন কোনো আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তারা বলছে, মামলা হয়েছে। ঘটনা দুটির আশপাশের সিসিটিভি দেখে তদন্ত করছে পুলিশ। দ্রুতই আসামি গ্রেপ্তার করা হবে বলেও জানায় থানা পুলিশ।
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানের ৬ নম্বর রোডে ফরমা আল আমিন ওরফে পাতা আল আমিনকে (২৬) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। শেরেবাংলা নগরের ছিনতাইয়ের ঘটনায় মোশারফের ভাই মান্নানকে পুলিশে ধরিয়ে দেন পাতা আল-আমিন। এ ধারণা থেকেই মোশারফসহ কয়েক দুর্বৃত্ত বুধবার সন্ধ্যায় আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যা করে। পাতা আল আমিন পুলিশের কাছে ফরমা আল আমিন হিসেবে পরিচিত।
এই ঘটনায় মামলা হয়েছে উল্লেখ করে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) এ কে এম মেহেদী হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে সন্ধ্যার দিকে আল আমিনকে ৬ নম্বর রোডে কুপিয়ে হত্যা করে মোশারফ বাহিনী। ঘটনায় পাশে উপস্থিত থাকা রিপন ওরফে গিট্টু রিপনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দ্রুতই জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
মৃত আল আমিনের পাঁচ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। তারা পরিবার নিয়ে চাঁদ উদ্যান ৫ নম্বর রোডে থাকেন। তাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার হাঁটুলিয়া বাগানবাড়ি এলাকায়। আল আমিনের বাবা রিপন বলেন, ‘মাগরিবের পরে আল আমিনের মায়ের মোবাইলে একজন ফোন করে জানান, কাজল আল আমিনকে খুঁজতেছে। এই ফোন পাওয়ার পরে আল আমিন বাসা থেকে বের হয়। পরে খবর পাই মোশারফরা আমার ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।’
এদিকে বুধবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর আদাবরের নবোদয় হাউজিং এলাকায় গাড়িচালক ইব্রাহিম শিকদারকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় সজীব ও রুবেল নামে দুজনকে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায়ও মামলা হলে ওই দুজনকেই আটক দেখানো হয়েছে। তবে নতুন কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি থানা পুলিশ।
এ বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, নিহতের শ্যালক অভিযুক্তদের ডিমের দোকানে কাজ করতেন। কদিন আগে ডিমসহ একটি ভ্যানগাড়ি উল্টে যায়। এতে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয় ওই ব্যবসায়ীর। এই অভিযোগে নিহত ইব্রাহিমের শ্যালককে মারধর করে তারা। পরে শ্যালককে মারধরের ঘটনায় সালিশ বসান ইব্রাহিম। এই সালিশে দুপক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মারামারি হয়। ওই ব্যবসারীর লোকজন মোটরসাইকেলে চলে যাওয়ার সময় এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলে মারা যান ইব্রাহিম। এই ঘটনায় আরও যারা জড়িত রয়েছে তাদের গ্রেপ্তারেও কাজ করছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা হয়ে ওঠে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকা। একের পর এক ছিনতাই-ডাকাতিতে নাভিশ্বাস ওঠে এলাকাবাসীর। এ অবস্থায় সেখানে বিশেষ অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে পাঁচ শতাধিক অপরাধীকে। এই এলাকাকে অপরাধমুক্ত করতে চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত মঙ্গলবার এই দুই থানার অপরাধ-কর্মকা- নিয়ে র্যাব-২ এর সিও (অতিরিক্ত ডিআইজি) খালিদুল হক তালুকদার বলেছেন, রাজধানীর মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় কোনো গডফাদার-সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না। গত একবছেরে যৌথবাহিনীর (সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব) অভিযানে এই এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ শতাধিক কিশোর গ্যাং, চিহ্নিত অপরাধী ও সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা যাদের ধরছি তারা প্রত্যেকে সন্ত্রাসী। সন্ত্রাসীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় হয় না। যেই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করবে আমরা তাদের আইনের আওতায় আনব। এখানে বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাংয়ের ছড়াছড়ি। সবাইকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলেও জানান র্যাবের এই কর্মকর্তা।
