সড়ক জুড়ে ময়লার স্তূপ ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৫, ১২:১০ এএম

কুমিল্লা নগরীর বুক জুড়ে লেখা রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দীর গৌরবগাথা। নবাব ফয়জুনেচ্ছার প্রজ্ঞা, রাজা বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের রাজকীয় দৃষ্টিভঙ্গি, সংগীতজ্ঞ শচীনদেব বর্মনের সুরস্রোত, ভাষাশহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মত্যাগ, আর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে উচ্চারিত বিদ্রোহ, সবকিছু মিলেই কুমিল্লা আজ এক জীবন্ত ইতিহাস।

এই কুমিল্লাই জন্ম দিয়েছে মহাস্থবির শীলভদ্রের মতো মনীষী, যিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি আচার্য। ইতিহাসবিদরা বলেন, পঞ্চম শতাব্দীতে যখন সভ্যতা হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছে, তখনই কুমিল্লা বিশ্বকে দিয়েছিল এক আলোকবর্তিকা শীলভদ্ররূপে। অথচ সময়ের স্রোতে সেই ঐতিহ্য যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। মাটির ঘ্রাণ আর শালীনতার ছায়া আজ চাপা পড়ে যাচ্ছে ইট-পাথরের দালান-কোঠার নিচে। এই নতুন নগরায়ণের ছদ্মবেশে মানুষের অসচেতনতা পরিবেশকে করছে বিষাক্ত। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনÑ সব মিলিয়ে কুমিল্লার মুখে যেন কালি লেপে দিচ্ছে সভ্যতার নামধারীরা।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) এলাকায় দ্রুত বাড়ছে জনসংখ্যা ও নগরায়ণের চাপ। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্যরে পরিমাণও। অথচ পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাবে শহরের নানা প্রান্তে যত্রতত্র ময়লা ফেলছেন বাসিন্দারা ও দোকানিরা। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১১ সালে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত কুসিক এলাকায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের বসবাস। প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দরকার অন্তত ৫০০টি ডাস্টবিন। অথচ বর্তমানে রয়েছে মাত্র ১০০টির মতো স্থায়ী ও অস্থায়ী ডাস্টবিন।

নগরের সংরাইশ, সুজানগর, চকবাজার, টমছম ব্রিজ, তেলিকোনা, রাজগঞ্জ, শাসনগাছা, রেইসকোর্স, নূরপুর, চৌধুরীপাড়া, ঝাউতলা, পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডসহ প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই ডাস্টবিন সংকট প্রকট। এতে খোলা জায়গা, ড্রেন, এমনকি কবরস্থানের ভেতরেও ময়লা ফেলা হচ্ছে। সুজানগর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো ডাস্টবিন নেই। মানুষ বাধ্য হয়ে কবরস্থানের সীমানা প্রাচীরের ভেতরেও ময়লা ফেলছে। বহুবার কুসিককে জানিয়েও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।

চর্থা এলাকার সুমন জানান, ইপিজেড সড়কের পাশে এক সময় ফুলের বাগান ছিল। এখন তা পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দা নন, শিক্ষার্থীরাও পড়ছেন দুর্ভোগে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী নুসাইবা তাবাসসুম বলেন, ‘সকালে ক্লাসে যাওয়ার সময় রাস্তায় এমন দুর্গন্ধ থাকে, নাক চেপে চলতে হয়। এদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনার কারণে শহরের ড্রেনগুলোতে জমছে প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালি বর্জ্য। বর্ষা মৌসুমে এসব ড্রেন জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কুসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, নতুন ওয়ার্ড সংযুক্ত হওয়ায় চাহিদার তুলনায় ডাস্টবিন কম। স্থান নির্ধারণে জটিলতা থাকায় সমস্যা হচ্ছে। বর্তমানে ১০০টি ডাস্টবিন রয়েছে, নতুন করে আরও ১২০টি বসানোর জন্য টেন্ডার করা হয়েছে।

ডেপুটি সিভিল সার্জন রেজা মো. সারোয়ার আকবর বলেন, বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ না হলে তা থেকে জীবাণুবাহী রোগ ছড়াতে পারে। শুধু ডাস্টবিন নয়, নাগরিকদের সচেতনতাও জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মামুন বলেন, স্থায়ী ডাস্টবিন বসাতে চাইলে এলাকাবাসী জায়গা দিতে চায় না। তাই অস্থায়ীভাবে প্লাস্টিকের ডাস্টবিন দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২০০টি দেওয়া হয়েছে, আরও ৫০০টি দেওয়া হবে। এ ছাড়াও আধুনিক নগরায়ণ করতে জগন্নাথপুর এলাকায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ডাস্টবিনের সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত