ষড়যন্ত্রে অংশীদার ছিলেন সে সময়কার কোচ রাসেল ডমিঙ্গো থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নীতিনির্ধারণী মহলের সবাই। হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল প্রকৃতিও। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে দেওয়ার কূটকৌশল হিসেবে মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে বানানো হয়েছিল ‘স্পঞ্জি’ উইকেট। সাফল্যের বাহবা কাজে লাগিয়ে চুক্তি বাড়াতে চাচ্ছিলেন ডমিঙ্গো, বোর্ড কর্তারাও চাচ্ছিলেন চটজলদি সাফল্য। তাতে করে ক্ষণিক সাফল্য এলেও ক্ষতি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদে। ৪ বছর পর, আরেক বর্ষায় ফিরে এলো সেই ভয়াল উইকেটের স্মৃতি। এবারে সেই ফাঁদে পড়া দলটির নাম পাকিস্তান।
অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টানা ১০টা ‘ভয়াবহ’ টি-টোয়েন্টির পর সাকিব আল হাসান বলেছিলেন, ‘দেখুন এই ৯-১০টা ম্যাচ যারা খেলেছে, সবাই অফ ফর্মে আছে। উইকেটটাই এমন। এখানে কেউ খুব একটা ভালো করেনি। ব্যাটসম্যানদের এই পারফরম্যান্স গণ্য না করাই ভালো। এ রকম উইকেটে কোনো ব্যাটসম্যান ১০-১৫টা ম্যাচ খেললে তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। কাজেই এই হিসাব না (কে রান করল না) করি আমরা।’ বাংলাদেশের বর্তমান টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাসও অধিনায়কত্ব পাওয়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন মিরপুরের উইকেট অনেক ব্যাটসম্যানের ক্যারিয়ার নষ্ট করে দিয়েছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগেও একই প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দেওয়া হলে বলেছেন, ‘আমি একমত অনেক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার খারাপ হয়েছে ব্যাটিংয়ে। আমি বোলার হলে আমার ক্যারিয়ার আপ হতো। বাংলাদেশ সিরিজ জিতেছিল। এটা বড় অর্জন। তবে আমার মনে হয় না এখন আর সেটা রিপিট হবে।’ তবে লিটনের আশাবাদ মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে, অন্তত সিরিজের প্রথম ম্যাচে। উইকেটের আচরণ সেই বছর চারেক আগের অস্ট্রেলিয়া সিরিজের মতোই।
খেলা শুরুর আগে পিচ রিপোর্টে আমির সোহেল বলেছিলেন, ‘উইকেটের ওপরের আবরণ শক্ত হলেও নিচে আর্দ্রতা আছে বলেই আমার সন্দেহ। স্পিনারদের বল একটু ধরবে, ফাস্ট বোলাররা যদি তাদের গতি কমায় তাহলে তারাও সুবিধা পাবে। ব্যাটসম্যানদের জন্য আমার উপদেশ হবে সাবধানী হয়ে খেলা। এসে উইকেটের একটা ধারণা নেওয়া, বাউন্সটা বোঝা এবং তারপর ব্যাট চালানো।’ লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়াম, যেখানে ২০০ রানও নিরাপদ নয় সেখান থেকে মিরপুরের উইকেটে এসে একই পদ্ধতিতে ব্যাটিং করতে গিয়েই বিপদে পড়েছেন পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা। ফল ১১০ রানেই অলআউট।
১০ ব্যাটসম্যানের ভেতর ৩ জন রান আউট, এর পেছনে অবশ্য উইকেটের কোনো দায় নেই। তাসকিন আহমেদের বলে ফ্লিক করতে গিয়ে ব্যাট হাতেই ঘুরে গেছে, ভেতরের কানায় লাগিয়ে বল পাঠিয়েছেন ডিপ ফাইন লেগে দাঁড়ানো ফিল্ডার মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে। তিনি নিয়েছেন ভালো একটা ক্যাচ, বিশেষ করে আগের ওভারেই তাসকিন নিজে যে সহজ ক্যাচটা ফেলেছেন এরপর যে কোনো ক্যাচই বাহবা পাওয়ার যোগ্য।
মাত্র ৭ উইকেট পেলেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই সিরিজটায় ব্যাটসম্যানদের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিলেন মোস্তাফিজ। বলের গতি কমিয়ে স্বাভাবিক সুইংটাকে উইকেটের সহায়তায় আরও দুর্বোধ্য করে তোলেন। বলে গতি কম, উইকেটে অসমান বাউন্স আর বৃষ্টিতে ভারী হয়ে থাকা আউটফিল্ডে ব্যাটসম্যানের উড়িয়ে মারার প্রবণতা। এই ত্রয়ীতেই বর্ষার মিরপুর যেন মোস্তাফিজের জন্য ‘টেইলর-মেড’ উইকেট। ৪ ওভারে মাত্র ৬ রান দিয়েছেন মোস্তাফিজ, নিয়েছেন ২ উইকেট। ১৮টা বলই দিয়েছেন ডট। ম্যাচের ষষ্ঠ ওভারে বোলিংয়ে এসেছিলেন, পঞ্চম ডেলিভারিতেই নেন হাসান নাওয়াজের উইকেট। পরের সাফল্য ১৭তম ওভার। মোটামুটি থিতু হয়ে যাওয়া খুশদিল শাহ টাইমিংয়ের গোলমাল করলেন মোস্তাফিজের অফস্টাম্পের বাইরের বলে, মিড অফে ক্যাচ দিলেন ৩০ গজ বৃত্তের রেখায় দাঁড়ানো রিশাদ হোসেনের হাতে।
সাফল্যের জন্য বিসিবির কর্তাব্যক্তিরা হাঁটলেন চেনা রাস্তাতেই। লিটন আশা করেছিলেন সেই কুখ্যাত উইকেট হয়তো আর ফিরবে না। অন্তত বিপিএলের সবশেষ আসর নানান বিষয়ে কুখ্যাতি কুড়ালেও উইকেট নিয়ে সমালোচনা নিন্দুকেও করবে না। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচেও উইকেট ব্যাটসম্যানদের জন্য এতটা দুর্যোগপূর্ণ ছিল না। কিন্তু মাস ছয়েক পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরতেই শেরে বাংলার উইকেট ফিরে গেল বছর চারেক আগে।
