আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৫, ০৭:৩৩ এএম

বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্প আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মানুষ মনজুর আলম বেগ। বেগার্ট ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি তার হাতে সৃষ্টি। ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইনস্টিটিউট গঠনেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য অবদান। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির মাসিক মুখপত্র ‘বিপিএস নিউজলেটার’ তারই মস্তিষ্কপ্রসূত। এর বাইরে ফটোগ্রাফি নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। এসব কারণে বাংলাদেশের আলোকচিত্রীদের কাছে তিনি ‘বেগ স্যার’ হয়ে উঠেছিলেন। শ্রদ্ধার শিরোপা হিসেবে পেয়েছিলেন ‘আলোকচিত্রাচার্য’ খেতাব।

ষাটের দশকের শুরুতে ঢাকার মতো একটি শহরে ফটোগ্রাফি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা ছিল এক দুঃসাহসী ব্যাপার। তিনি যখন এই উদ্যোগ নেন তখন তার বয়স মাত্র ৩০ বছর। কোন তাগিদ থেকে তিনি বেগার্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এর পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ গল্প। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে প্যান্সডকের চাকরি ছেড়ে করাচি থেকে ঢাকায় আসেন মনজুর আলম বেগ। ঢাকায় এসে বড় বোন আমেনা বেগমের নর্থ ব্রুক হল রোডের বাসায় ওঠেন। বোনকে জানান তিনি একটা স্টুডিও করতে চান। বোন তাকে কিছু টাকা দেন। সেই টাকায় তিনি ৩৩ তোপখানা রোডে ‘রক্সি ফটো সার্ভিস’ নামে একটি স্টুডিও স্থাপন করেন। স্টুডিওর দুজন কর্মচারী। একদিন এক কর্মচারী উধাও। ডার্করুমের জিনিসপত্র সবই ঠিকঠাক, শুধু দেয়ালে লাগানো ডেভেলপার ফর্মুলাটা নেই। কয়েকদিন পর ওই কর্মচারীর সঙ্গে দেখা। কর্মচারী বললেন, ‘আমি একটি অন্যায় করে ফেলেছি। আপনাকে না বলে ডার্করুম থেকে ডেভেলপার ফর্মুলাটা নিয়ে গিয়েছিলাম।’ বেগ সাহেব বললেন, ‘চাইলেই তুমি পেতে পারতে।’ কর্মচারী বললেন, ‘এগুলো সিক্রেট জিনিস, কেউ কাউকে দিতে চায় না।’ এ কথা শুনে বেগ সাহেব খুবই আশ্চর্য হলেন এবং আলোকচিত্র শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠার কথা ভাবলেন। ১৯৬০ সালে ২১ ডিসেম্বর রক্সি স্টুডিওতেই তিনি বেগার্ট প্রতিষ্ঠা করলেন। ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় বেগার্টের যাত্রা। এরপর এ দেশের হাজার হাজার তরুণকে তিনি ফটোগ্রাফি শেখাতে উদ্বুদ্ধ করেন।

১২৬২ সালে পথিকৃৎ আলোকচিত্রী গোলাম কাসেম ড্যাডি, ইউসুফ মোহাম্মদ প্যাটেল ও মনজুর আলম বেগ মিলে ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৪ সালে ইউসুফ সাহেব মারা গেলে এই ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব বেগ সাহেবের কাঁধে এসে বর্তায়। ১৯৭৫ সালে ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব থেকে বের হয়ে তিনি বিপিএস প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আলোকচিত্র অঙ্গনকে একটা সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যান তিনি। এর আগে ১৯৭৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় তার লেখা বই ‘আধুনিক ফটোগ্রাফি’। বইটির জন্য কলকাতার অসংখ্য পাঠক তাকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখেন। কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে উল্টো; প্রশংসার পরিবর্তে শুনতে হয়েছে নিন্দা। বইটি পাঠকনন্দিত হওয়ার কারণে কোনো কোনো মহলের ঈর্ষার মুখেও পড়েছিলেন। বেগ সর্বশেষ যে বইটা লিখেছিলেন তার নাম রেখেছিলেন ‘লাস্ট ম্যানুয়াল অব ফটোগ্রাফি’। ইংরেজিতে লেখা বইটা শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। কেন বইয়ের এমন নামকরণ, এ নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ফটোগ্রাফির সনাতন পদ্ধতি গুরুত্ব হারাতে থাকবে।

মনজুর আলম বেগ ছিলেন সাধক স্বভাবের। তার ভাবনা ছিল গভীর; ভাষা নিয়ে সদা চিন্তাভাবনা করতেন। ‘আকাশ থেকে সমুদ্রের বিশালতা বোঝা যায়/ গভীরতা জানা যায় না।/ মাটি থেকে আকাশকে দেখা যায়/ সাদামাটা মলাটের মতো/ অথচ কত রং সাদার গভীরে, কতটুকু জানি?’ তার কাব্যভাষা এমনই প্রাঞ্জল। ‘স্রষ্টার সঙ্গে সংলাপ’ শিরোনামে তিনি একটি বই লিখেছিলেন। ১৯৯৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলার অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনকে তিনি বইটি উপহার দিয়েছিলেন। মৃণাল সেন সেদিন তার বক্তব্যে মনজুর আলম বেগকে একজন দার্শনিক হিসেবে উল্লেখ করেন। হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান আলোকচিত্রী ও শিল্পসমালোচক মহোলী ন্যাগির একটা উক্তি ‘ভবিষ্যতে অশিক্ষিত তারাই যারা কলম ও ক্যামেরার ব্যবহার জানবে না।’ বেগ স্যার মনেপ্রাণে এ কথা বিশ্বাস করতেন এবং তার ছাত্রদের ছবি তোলার পাশাপাশি লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি মনে করতেন, ফটোগ্রাফারদের অনুভূতি, ছবির নিগূঢ় রহস্য আর জানা-অজানা তথ্য নিজেদেরই লিখতে হবে। যে কোনো শিল্পমাধ্যমকে গণমানুষের কাছে নিয়ে যেতে হলে লেখালেখির বিকল্প নেই।

শিক্ষকতা, লেখালেখি, গবেষণা ও সাংগঠনিক কাজেই সারা জীবন ব্যস্ত থেকেছেন মনজুর আলম বেগ। এছাড়া নিজের খেয়ালে ছবি আঁকতেন, ভাস্কর্য বানাতেন। ছবির জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, তুরস্ক রাশিয়া, জার্মানি, কানাডা থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন। ১৯৮২ সালে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব দমদম আয়োজিত ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি সম্মেলনে বিশ্বের দশজন বরেণ্য আলোকচিত্রীর সঙ্গে তাকেও ফেলোশিপ প্রদান করে। ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ফটোগ্রাফি [ফিয়াপ] ১৯৮৭ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে তাকে ইএসএফআইএপি সম্মানে ভূষিত করে। ওয়াশিংটন টাইমস কর্তৃক প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড আই’ বার্ষিক প্রকাশনার মূল্যায়ন ‘এম এ বেগ হ্যাজ বিন ইনস্ট্রোমেন্টাল ইন প্রমোটিং অ্যান্ড টিচিং ফটোগ্রাফি ইন বাংলাদেশ।’ ১৯৯৫ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিস [ইউএসআইএস] তাকে বাংলাদেশের একজন সেলিব্রেটি হিসেবে মূল্যায়ন করে। আলোকচিত্রশিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৭ সালে তিনি মরণোত্তর একুশে পদক পান।

মনজুর আলম বেগ ‘এম এ বেগ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তার জন্ম-তারিখ অজানা। তবে শিক্ষাসনদ অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৩০ সালের ১ অক্টোবর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর গ্রামে মাতুলালয়ে। কৈশোর কাটে বাবার কর্মস্থল বরিশালে। ১৯৪৭ সালে বরিশালে এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করা কোডাক ক্যামেরায় ছবি তোলা শুরু করেন। এরপর ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়ে সুইজারল্যান্ডের ফটোগ্রাফার কুর্ট ব্লুমের কাছে ফটোগ্রাফি শেখেন। দ্বিতীয় দফায় প্যান্সডকে পাঁচ বছর চাকরি করার পর ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশ সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে রিপ্রোগ্রাফি বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য লন্ডনে যান। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে কোর্স সমন্বয়কারী তাকে যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব করেন। তিনি বিনয়ের সঙ্গে সে প্রস্তাব উপেক্ষা করে দেশে চলে আসেন। তিনি তার সমন্বয়কারীকে বলেছিলেন, ‘আমার ফটোগ্রাফি জ্ঞান তোমার দেশে তেমন কোনো কাজে লাগবে না। কিন্তু এ জ্ঞান আমার দেশের অনেক উপকারে আসবে। দেশের জন্য কিছু করতে পারাটা আমার জন্য অনেক বড় কাজ।’

মনজুর আলম বেগের জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল তার বড় ছেলে ইফতিখার আলম বেগের আকস্মিক মৃত্যু। ১৯৮৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ইফতিখার। ছেলের মৃত্যুতে তার চোখে কান্না আসেনি কিন্তু দেহমনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তাতে তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে শুরু করেন। হৃদরোগের পর ক্যানসারে আক্রান্ত হলেন। অসুস্থ শরীরেও তিনি আলোকচিত্রের নানা বিষয়ে নিরীক্ষায় নিমগ্ন থাকতেন। আলোকচিত্রই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। এ দেশের ফটোগ্রাফির উন্নয়নে তিনি যা করেছেন সেই তুলনায় তার প্রাপ্তি অতি সামান্য। মারা যাওয়ার মাত্র ১৫ দিন আগে তাকে ‘আলোকচিত্রাচার্য’ খেতাবে ভূষিত করে তারই হাতেগড়া সংগঠন বিপিএস। ওই দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সশরীরে উপস্থিত থেকে তার সম্মাননা গ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু শরীর সায় না দেওয়ায় তিনি অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি। ফলে বাসায় এসে তাকে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। এই সম্মান পেয়ে তিনি অভিভূত। ছল ছল চোখে তিনি সবার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবেগ ঝেড়ে তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমার তো দিন শেষ। আপনারা রইলেন, ফটোগ্রাফির উন্নতির জন্য সম্ভব হলে কিছু করবেন।’

তার অন্তিম ইচ্ছা মৃত্যুর পর বেগার্ট ছেড়ে যেন তাকে অন্য কোথাও না নেওয়া হয়। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা না করারও নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই আমাদের ছেড়ে চলে যান আলোকচিত্রের এই মহান শিক্ষক। তার ২৭তম প্রয়াণবার্ষিকীতে প্রণতি জানাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত