নিয়োগ বাণিজ্যের টাকা উদ্ধারের নামে ৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের একজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতার নাম আহসান হাবিব। তার দাবি আহসান সাবিনা ইয়াছমিন ও এমরান হোসেনসহ একটা চক্র রয়েছে যারা চাকরি দেওয়ার নাম করে মানুষদের থেকে টাকা নেয়।
এ নিয়ে গত বুধবার (২৪ জুলাই) ভুক্তভোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে লিখিতভাবে একটি অভিযোগ জমা দেন। ভুক্তভোগীর নাম সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি বাংলা বিভাগের একজন সাবেক শিক্ষার্থী।
অভিযোগপত্রে সাবিনা ইয়াছমিন লেখেন, তিনি গত ২৫ মার্চ রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মচারী মো. এমরান হোসেনের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নামে ৫৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে এমরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বরখাস্ত হন। ওই ঘটনার কিছুদিন আগে চবি ছাত্রদল কর্মী আহসান হাবিব তার টাকা উদ্ধারে সহযোগিতা করার কথা বলে তার কাছ থেকে দুটি চেক নেন—একটি ১৫ লাখ এবং অপরটি ৩ লাখ টাকার। পরে ১৫ লাখ টাকার একটি চেক ফেরত দিলেও ৩ লাখ টাকার চেকটি আর ফেরত দেননি। চেক ফেরত চাইলে হাবিব শুরুতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন এবং একপর্যায়ে জানিয়ে দেন, তিনি ওই চেক ফেরত দেবেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শিরীণ আখতারের আমলে ১৫ জনকে চাকরির আশ্বাস দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নমান সহকারী মো. এমরান হোসেন, যিনি ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের একজন কর্মী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার নাম করে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিনের কাছে থেকে ৫৮ লাখ টাকা নেন। তবে নানাভাবে লবিং করলেও চাকরি দিতে পারেননি এমরান।
পরবর্তীতে ইয়াসমিনের ৫৮ লাখ টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করেন তিনি। এসময় ভুক্তভোগীকে টাকা উদ্ধারে সহযোগিতার আশ্বাস দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের অনুসারী ছাত্রদল নেতা আহসান হাবিব।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এমরানের পক্ষ নিয়ে ইয়াসমিনের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন চবি ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন। ছাত্রদল নেতা আহসান হাবিব টাকা উদ্ধার করে না দিয়ে উল্টো ইয়াসমিনের ৩ লক্ষ টাকার ব্যাংক চেক আত্মসাৎ করেন। ব্যাংক চেক ফেরত চাইলে আহসান হাবিব দিতে অস্বীকার করেন এবং তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শিরীণ আখতারের আমলে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ইয়াসমিন থেকে ৫৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী এমরান হোসাইন। তবে উপাচার্য শিরীণ পদচ্যুত হওয়ায় আর চাকরি দিতে পারেননি এমরান। এরপর থেকেই টাকা ফেরত নিতে এমরানের পিছু ছুটছেন ভুক্তভোগী নারী ইয়াসমিন। প্রায় ২ বছর পার হলেও টাকা ফেরত পাননি তিনি।
ভুক্তভোগীর কাছে থেকে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা আহসান হাবিব টাকা পেতে সাহায্য করবেন বলে ভুক্তভোগী ইয়াসমিনকে আশ্বাস দেন। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি প্রতারক এমরান ছাত্রদল নেতা হাবিবের মধ্যস্থতায় ইয়াসমিনকে পাওনা টাকার ১০ লাখ টাকা প্রদান করবে বলে জানায়। ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তাকে হাটহাজারীর হোটেল জামানে যেতে বলা হয়। টাকা ফেরত পাওয়ার আশ্বাসে তিনি হোটেলে গিয়ে দেখেন অভিযুক্ত এমরানের হয়ে কথা বলতে এসেছেন চবি ছাত্রদল সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন ও ৩০-৪০ জন ছাত্রদল কর্মী।
তিনি আরও বলেন, টাকা কম নিতে ইয়াসমিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন ছাত্রদের নেতাকর্মীরা। পরে ইয়াসমিন সেখান থেকে চলে আসেন। কিছুদিন পর ছাত্রদল সভাপতি মহসিনসহ টাকা উদ্ধার করার আশ্বাসে ১৫ লাখ ও ৩ লাখ টাকার দুইটি ব্যাংক চেক হাবিবকে দেন ইয়াসমিন। এরপর টাকা উদ্ধার না করে উল্টো ইয়াসমিনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন ছাত্রদল নেতা আহসান হাবিব। পরে ইয়াসমিনকে ১৫ লাখ টাকার চেক ফেরত দিলেও ৩ লাখ টাকার চেক হাবিব এখনও ফেরত দেয়নি।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, হাবীব আমাকে টাকা ফেরত দিবে বলে হাটহাজারীর হোটেল জামানের ৪র্থ তালায় নিয়ে যায়। সেখানে ইমরানের পক্ষ হয়ে চবি ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন, শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ইয়াসিনসহ বেশ কয়েকজন আসে। আমি যেন এমরানের কাছে থেকে মাত্র ১৫ লাখ টাকা ফেরত নিই এজন্য তারা আমার সঙ্গে জোর জবরদস্তি করেন। হাবীব জানান, আমার পাওনা ৫৮ লাখ টাকা ৩ ভাগে ভাগ হবে। এক অংশ আমি পাবো, বাকি অংশ অন্যদের মাঝে ভাগ হবে। আমি তাদের প্রস্তাবে রাজি হইনি।
ছাত্রদলের সভাপতি মহসিন ইমরানের কাছ থেকে একবার পাঁচ হাজার এবং সাত হাজার টাকা নিয়েছে বলে জানান হাবীব। এরপর হাবিব টাকা উদ্ধার করবে বলে দুটো চেক নিলেও ৩ লাখ টাকার চেক ফেরত দেয়নি।
জানতে চাইলে এই বিষয়ে অভিযুক্ত আহসান হাবীব বলেন, সাবিনা ইয়াছমিন ও এমরানসহ একটা চক্র রয়েছে যারা চাকরি দেওয়ার নাম করে মানুষদের থেকে টাকা নেয়। তাদের দু'জনের মাঝে টাকা নিয়ে বুনিবনা না হওয়ায় এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ নিয়ে এসেছে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট।
তিনি আরও বলেন, জামান হোটেলে এমরান আর সাবিনার মাঝে দ্বন্দ্ব চলছিল। স্থানীয়রা জানতে পেরে আমাদের খবর দেয়, কেননা বিএনপির পার্টি অফিস সেখানেই। এরপর বিষয়টি নিয়ে দলের সিনিয়ররা চবি ছাত্রদলের সভাপতি মহসিনসহ বেশকিছু লোক সেখানে যায় সমাধান করার জন্য। ইমরানের থেকে মহসিন ভাই টাকা নিয়েছে এটা মিথ্যা কথা, রাজনৈতিক ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এসব বলেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চবি ছাত্রদল সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ বলেন, এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি, তবে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে অ্যাকশনে যাওয়া যায় না। একটা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সমস্যার সমাধান করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি শেষ হলে বোর্ড অব হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারির সভা আয়োজন করে বিষয় তদন্ত করার জন্য একটা কমিটি গঠন করতে হবে। এককভাবে তদন্ত করার কোনো নিয়ম নাই।
তিনি আরও বলেন, আবার আমরা টাকা আত্মসাতে অভিযোগের বিপরীতে একটা আবেদনপত্র পেয়েছি। মূলত একটা সফট কপি পেয়েছি, হার্ড কপি কার কাছে আছে জানি না। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিও মিথ্যা অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে একটা আবেদন করেছেন।
