শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৫, ০৩:৪৬ এএম

আমি ভয় পাই। ভয় পাই হঠাৎ ঘরে আলো নিভে গেলে। ভয় পাই অচেনা মুখ দেখলে, একা হলে বা বদ্ধ কোনো ঘরে। আমি জানি, ভয়গুলো সবসময় যুক্তি মানে না। তবু ভয় পাই। আতঙ্ক আমাকে ছাড়ে না। ধীরে ধীরে আমি নিজের ভেতর কুঁকড়ে যেতে থাকি। কারণ আমি শিশুবেলায় ভয় পেতাম। কাঁদলে বলা হতো, ‘এত ভয় পাও কেন?’, ‘তুমি তো বড় হচ্ছো!’ তখন বুঝিনি, আজ বুঝি ভয় পেলে সাহস দরকার হয়। সাহস মানে ‘ভয় না পাওয়া’ নয়, সাহস মানে ‘ভয়ের সময় পাশে কেউ থাকা’। আমার ছোটবেলার অনেকগুলো ভয়াবহ স্মৃতি আছে, যেগুলো কাউকে বলিনি। ভয়, কষ্ট, অপমান এগুলো জমে আছে মনে বহু বছর। তখন শিশু ছিলাম। তখন কেউ শুনতে চাইত না আমার কথা। বুঝতে পারতাম, ছোটদের কষ্ট বুঝতে চায় না বড়রা। এখনো হয়তো অনেকেই তেমনি করে ভাবে। আমার মতো অনেক শিশু আছে যারা দুঃসহ অভিজ্ঞতা মনে বয়ে বেড়াচ্ছে চুপচাপ। তারা মুখ খোলে না, শুধু চুপ করে যায়। তাদের চোখের কোনায় কান্না জমে থাকে, আর ভয় জমাট বাঁধতে থাকে মনের ভেতর। কেউ বলে না, কিন্তু ওই চুপ করে থাকাটাই শিশুদের সবচেয়ে বড় চিৎকার।

আজ আমার সামনে সেই ভয় নিয়ে লড়ছে কয়েকজন শিশু। মাইলস্টোন স্কুলের শিশুরা। যে ভয় তারা পেয়েছে, তা শুধুই কোনো মুহূর্তের নয় তা এখনো তাদের শরীর, মন আর ঘুমের মধ্যে ফিরে আসছে। হঠাৎ শব্দে চমকে ওঠে, চোখ ভিজে ওঠে তাদের, মন গুটিয়ে যায়। স্কুল মানেই তাদের কাছে এখন আতঙ্ক। ক্লাসরুম মানেই মৃত্যু দেখার স্মৃতি। আমাদের কল্পনার বাইরে ঘটনা ঘটে গেছে। ঢাকার মাইলস্টোন স্কুলের উত্তরা দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের শিশুরা তখন নিজেদের মতো ব্যস্ত। স্কুল শেষ হয়েছে, কেউ বাড়ি ফিরছে, কেউ তখন অতিরিক্ত ক্লাসে, কেউ বন্ধুর সঙ্গে ফিরবে বলে অপেক্ষায় আছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ থেকে স্কুলের ওপর বিধ্বস্ত হয়ে পড়ল এক বিমান। শিশুদের জন্য আমরা যে যুদ্ধহীন পৃথিবী চেয়েছি, সেখানে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণের বিমান আছড়ে পড়েছে শিশুদের ওপর। আতঙ্ক, বিস্ময় আর কান্নার এক বিভীষিকাময় মুহূর্ত যা কোনো শিশুর মনে চিরস্থায়ী ক্ষতের মতো গেঁথে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। যারা এই ঘটনায় শারীরিকভাবে বেঁচে গেছে, তাদের অনেকে মানসিকভাবে সেই মুহূর্তে আটকে আছে এখনো। এটি শুধু একটি আচমকা ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয় একটি মানসিক ভূমিকম্প। এমন ঘটনায় শিশুদের মনে ভয়, দুঃখ, অপরাধবোধ এমনভাবে জমে থাকে যে, তারা মুখে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। আর এই ক্ষয়টাই সবচেয়ে ভয়ংকর, যদি আমরা এখনই সেইসব শিশুর পাশে না দাঁড়াই।

তারা বেঁচে আছে তবে কেবল বাহ্যিকভাবে নয়, তাদের ভেতরের পৃথিবীও যেন ধ্বংসস্তূপ। আর এখনই সময় আমরা বড়দের, আমরা যারা বাবা-মা, অভিভাবক, শিক্ষক, বন্ধু, সমাজের মানুষ আমাদের উচিত তাদের হাত ধরা, কাঁধে হাত রাখা, চোখে চোখ রেখে বলা ‘তোমার ভয় পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। আমি তোমার পাশে আছি।’ ‘ট্রমা’ বা মানসিক আঘাত শিশুর আচরণ, ঘুম, খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস, আত্মবিশ্বাস, এমনকি শিক্ষার আগ্রহকেও প্রভাবিত করে। অনেক শিশু আতঙ্কে রাতের ঘুম হারিয়ে ফেলে, হঠাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে, একা থাকতে ভয় পায়, স্কুলে যেতে চায় না, এমনকি স্বাভাবিক কথাবার্তার মধ্যেও তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। শিশুরা বোঝে অনেক কিছু, কিন্তু সবসময় বলতে পারে না। তারা কখনো কথা না বলে চোখে, আচরণে, ছবি আঁকায় বা খেলাধুলায় নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে। তাই শিশুর নীরবতাকেও আমাদের বুঝে নিতে হবে। শিশুর কথা শোনার সময় এখনই শিশুরা সব কথা মুখে বলে না। অনেক সময় তারা শুধু চুপ করে যায়। কিন্তু সেই চুপ করাটাই সবচেয়ে বড় চিৎকার। যদি কোনো শিশু কিছু বলতে চায়, দয়া করে থামাবেন না। জিজ্ঞেস করবেন না, ‘এতবার বলছ কেন?’ বলবেন, ‘তুমি যা বলবে, আমি শুনব। আমি আছি।’ এই শোনাটাই শিশুর জন্য প্রথম সান্ত্বনা। শিশুর ভয়কে না বলবেন না বরং তাকে জায়গা দিন। আমরা অনেক সময় বলি, ‘ভয় পেলে হবে না’। কিন্তু এতে শিশু ভাবে, ভয় পাওয়া যেন ভুল। অথচ, ভয় পাওয়া তো মানুষের সহজাত অনুভব। বরং শিশুকে বলুন, ‘তুমি ভয় পেয়েছ, এটা একদম স্বাভাবিক। এই ভয় থেকে বের হতেই তো আমি তোমার পাশে আছি।’ এই ছোট বাক্যটি শিশুদের মনে জোর তৈরি করে যে, কেউ আছে যে বোঝে। নিরাপদ বোধ ফিরিয়ে আনুন ভয়ের পর শিশুরা নিজেদের একা ভাবে, তটস্থ থাকে, ছোট ছোট শব্দেও চমকে ওঠে। এমন সময় শিশুকে বারবার বলুন, ‘তুমি এখন নিরাপদ।’ ‘তোমার কিছু হবে না। আমি আছি।’ এই আশ্বাস শিশুর ভেতর শান্তির আলো জ্বালায়। আঁকা, খেলা আর গল্প বলাই শিশুর ভাষা অনেক শিশু ভয়, কষ্ট বা যন্ত্রণার কথা মুখে বলতে পারে না। তারা আঁকবে, খেলবে, কল্পনার গল্প বলবে। সেখানেই তারা প্রকাশ করবে কী দেখেছে, কী হারিয়েছে, কী অনুভব করছে। তাই শিশুকে কাগজ-কলম দিন, খেলার সুযোগ দিন, কিংবা পাশে বসে গল্প বলুন। ছবি আঁকতে আঁকতেই তারা মনের জমাট কান্না গলিয়ে ফেলবে।

ঘুম, খাওয়া আর আচরণে চোখ রাখুন শিশু হয়তো হঠাৎ ঘুম ভেঙে চিৎকার করছে, একা ঘরে যেতে চায় না, কথায় বিরক্ত হচ্ছে বা একেবারে চুপ হয়ে গেছে। এগুলোকে ভুলে যাবেন না। এগুলো ভেতরের ভয় আর ট্রমার প্রতিক্রিয়া। প্রতিদিন জিজ্ঞেস করুন, ‘তুমি কেমন আছ?’ ‘আজ রাতে আমি তোমার পাশে থাকব, ঠিক আছে?’ মানসিক যতœ মানেই ভালোবাসার গভীর রূপ শরীরের আঘাত যেমন ডাক্তার দেখে, তেমনি মনের ক্ষতও বিশেষজ্ঞ দিয়ে সারানো দরকার হয়। অনেক সময় শিশুর ট্রমা এতটাই গভীর হয় যে তা পেশাদার সহায়তা ছাড়া কেটে ওঠে না। এটা দুর্বলতা নয়, বরং সাহস আপনি জানেন, কোথায় সাহায্য দরকার। প্রশ্ন নয়, স্পর্শ হোক উত্তর ঘটনা নিয়ে শিশুকে জিজ্ঞেস করা ‘তুমি কী দেখেছিলে?’, ‘তুমি কাঁদছিলে?’ এই প্রশ্ন শিশুর মনে সেই ভয় আবার ফিরিয়ে আনে। তাই প্রশ্ন নয়, বরং বলুন ‘তুমি যদি কিছু বলতে চাও, আমি শুনব। তুমি যদি কিছু না বলো, তাও ঠিক আছে। আমি আছি তোমার পাশে।’

স্কুল হোক নিরাপত্তার আশ্রয় শিশুদের স্কুল এখন অনেকের কাছেই আতঙ্কের জায়গা। তাই স্কুলকে এমন করে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কেবল পড়াশোনা নয় আছে খেলার মাঠ, ছবি আঁকার দেয়াল, গান, নাটক, গল্প। একটা ভালোবাসার জায়গা, যেখানে শিশুরা আবার স্বপ্ন দেখতে শিখবে। শুধু বই আর ক্লাস নয়, স্কুলে শিশুদের জন্য দরকার নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে তারা খেলতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, গান গাইতে পারে। এসব সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে শিশুরা ধীরে ধীরে আবার স্কুুলকে ভালোবাসতে শিখবে। ভয়ের ঘরে ফেরার মতো কঠিন কিছু নেই। স্কুুল এখন অনেক শিশুর চোখে আতঙ্ক হয়ে আছে। স্কুলের ক্লাসরুম, বেঞ্চ, করিডর সবকিছুতেই হয়তো ট্রিগার হয়ে উঠবে শিশুদের মনে সেই দিনের ভয়াবহ সব স্মৃতি। তাই বাবা-মা, অভিভাবক, স্কুুল কর্র্তৃপক্ষ আর শিক্ষকরা যেন এ কথা মনে রাখেন এই শিশুদের কাছে এখন স্কুুল মানে শুধু পড়া শেখার জায়গা নয়, বরং নিজেকে ফিরে পাওয়ার নিরাপদ আশ্রয়। ধৈর্য ধরুন, জোর নয় শিশুরা সময় নেয়। কেউ তাড়াতাড়ি আগের জীবনে ফিরতে পারে, কেউ পারে না। তাদের জোর করে স্কুুলে পাঠানো, ‘এইটুকুতেই ভয়ে থাকো?’ বলা এসব কখনো উপকার করে না। বরং নরম গলায় বলুন ‘তুমি যেদিন রেডি হবে, আমি তোমার সঙ্গে যাব।’

বড়দের নিতে হবে অনেক বড় দায়িত্ব শিশুরা খুবই সংবেদনশীল। তারা আমাদের চোখ, গলার আওয়াজ, আচরণ সবকিছু থেকে অনুভব করে নিচ্ছে, তারা আসলে কতটা নিরাপদ। তাই বড়রা যদি নিজেরাই আতঙ্কিত, ধৈর্যহীন বা উপেক্ষাপূর্ণ, কিংবা পরস্পর অস্থির আচরণ করেন, তবে শিশু নিজের ভয় আরও গভীরভাবে ধারণ করবে। এই সময়ে বাবা-মা, অভিভাবক বা শিক্ষকদের উচিত হবে নিজের মানসিক অবস্থাও স্থির রাখা, প্রয়োজনে নিজেরাও কাউন্সেলিং নেওয়া। মনে রাখতে হবে, শিশুর জন্য আমরা যতটা শান্ত, ধৈর্যশীল ও আগলে রাখা মানুষ হয়ে উঠতে পারব, শিশু তত দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। এই শিশুদের পাশে থাকা মানে ভবিষ্যতের পাশে থাকা এই ছোট্ট মুখগুলো একদিন বড় হবে। তারা হবে আমাদের দেশের শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, কবি। তাদের ভেতরে যদি এখন ভয় জমে থাকে, তারা কখনো স্বাধীনভাবে মুক্ত মানুষ হয়ে নিজেকে মেলে ধরতে পারবে না। কিন্তু যদি এখনই আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই, বলি, ‘তোমার ভয়টা আমি বুঝি। আমি আছি তোমার সঙ্গে। তুমি একা নও।’ শিশুদের এই ভবিষ্যৎ আমাদের হাতেই। আমরা যদি এখন তাদের এমন মানসিক আঘাত থেকে আগলে না রাখি, তবে ভয় তাদের মনে এক দীর্ঘ জীবনের যন্ত্রণা হয়ে রয়ে যাবে। আমরা যদি তাদের কথা না শুনি, যদি না বুঝি তাদের না বলা কষ্ট, তাহলে আমাদের সন্তানরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এক গভীর নিঃসঙ্গতায়। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে। শুধু মাইলস্টোন স্কুলের ঘটনা নয়, আমাদের দেশে প্রতিদিন কোনো না কোনো শিশু নির্যাতন, দুর্ঘটনা, বিচ্ছেদ বা অন্য কোনো ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন সময় শিশুদের কথা শোনা, বোঝা, ভালোবাসা ও তাদের পাশে থাকার। এই শিশুদের ভবিষ্যৎ আমাদের বড়দের হাতে। আমরা যদি এখনই উদ্যোগ না নিই, তাহলে তারা বড় হয়ে উঠবে এক গভীর হতাশা নিয়ে, যা তাদের সারা জীবনের পথকে অন্ধকারে ঢেকে দেবে। শিশুরা স্বপ্ন দেখে। তারা নতুন করে শুরু করতে চায়, যদি কেউ পাশে থাকে। তারা অন্ধকার থেকেও আলো আঁকতে পারে, যদি কেউ হাত ধরে। তারা কান্নার ভেতর থেকেও হাসি খুঁজে পায়, যদি কেউ ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখে। আসুন, আমরা সেই মানুষটি হই যে শিশুর ভয় বুঝবে, পাশে থাকবে এবং বলবে ‘তোমার ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক, আমি তোমার পাশে আছি।’ এই একটি কথাই হতে পারে শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার শুরু। আজ যারা শিশু, তারাই আগামী দিনের আলো। আসুন, সেই আলোকে আগলে রাখি ভালোবেসে, বুঝে, পাশে থেকে।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত