পেট্রোবাংলার সেমিনার

গ্যাস অপচয়ে বছরে ক্ষতি প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৫, ০৮:১৯ এএম

গ্রহণযোগ্য ২ শতাংশ অপচয় বাদ দিয়েও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্যাস বিতরণ লাইনে গ্যাসের অপচয় হয়েছে গড়ে ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। আর গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) মার্চ পর্যন্ত ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ গ্যাস অপচয়ের ফলে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর বাইরে সঞ্চালন লাইনে অপচয় হয়েছে ২ শতাংশ।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পেট্রোসেন্টারে আয়োজিত ‘দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়; গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য উপস্থাপন করেছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)।

গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে কারিগরি ক্ষতির কারণে কিছু গ্যাসের অপচয় হয়, যাকে সিস্টেম লস বলে। এটি সর্বোচ্চ ২ শতাংশের মতো হলেও দেশে এই অপচয় অনেক বেশি। অতিরিক্ত এই অপচয় মূলত গ্যাস চুরি, যাকে সিস্টেম লস হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গ্যাসের অপচয় ও চুরি রোধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে ছয়টি গ্যাস বিতরণ সংস্থা। দেশের গ্যাস খাতের চিত্র তুলে ধরে সেমিনারে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, ‘দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমতে কমতে ১৫ বছর আগের জায়গায় চলে গেছে। গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের কোনো বিকল্প নেই। অনুসন্ধান কার্যক্রম যেভাবে হওয়ার দরকার ছিল, তা না হওয়ায় আজকে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। কূপ খনন আরও বাড়াতে হবে, না হলে আমদানি করে গ্যাসসংকট মোকাবিলা করা কঠিন। গভীর সমুদ্রে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

পাশাপাশি গ্যাস চুরি ও অপচয় কমানোর তাগিদ দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সঞ্চালন ও বিতরণ মিলে কারিগরি ক্ষতি প্রায় ১০ শতাংশ, যা অনেক বেশি। সঞ্চালন লাইনে কারিগরি ক্ষতি কোনোভাবেই ২ শতাংশ হওয়ার কথা নয়। এটি ভালো করে দেখা উচিত।

পেট্রোবাংলা বলছে, গ্যাস অপচয়ের জন্য দায়ী হচ্ছে পুরনো, জরাজীর্ণ পাইপলাইন; গ্যাস সরবরাহ লাইনের গ্যাসস্টেশন রাইজারে লিকেজ (ছিদ্র); তৃতীয়পক্ষের উন্নয়নকাজে পাইপলাইন ছিদ্র হওয়া এবং আবাসিক খাতে প্রচুর অবৈধ সংযোগ। তবে এসব অপচয় রোধে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানায় পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় মিটারিং/মনিটরিং ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা; লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কারিগরি ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা; অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও উচ্ছেদ কার্যক্রম জোরদার করা এবং আবাসিক গ্রাহকদের প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা।

গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করেই শিল্পে নতুন সংযোগ : সেমিনারে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, সঞ্চালন লাইনে কারিগরি ক্ষতির বিষয়টি গভীরভাবে দেখা হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ বন্ধে পেট্রোবাংলা তৎপর আছে, খোঁজ পেলেই বিচ্ছিন্ন করা হবে। তিনি বলেন, গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সরকারের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ বিষয়ে ডেডিকেটেডভাবে কাজ করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণ এবং সাংবাদিকরা সহায়তা করতে পারেন এ ব্যাপারে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, শিল্পে নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যেহেতু তারা বেশি দাম দেবে। তাই অগ্রাধিকার বিবেচনা করে তিনটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম ধাপের তালিকায় থাকছে, যেসব কারখানায় এখনই সংযোগ দেওয়া যাবে। এগুলো সরেজমিন পরিদর্শন প্রায় শেষের দিকে, আগামী সপ্তাহে শেষ হয়ে যাবে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা বিবেচনার পর চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্যাস অনুসন্ধান ও এলএনজি আমদানি : অন্য এক প্রশ্নের জবাবে রেজানুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট কাটাতে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে আরও সক্রিয় করা হচ্ছে। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহ করতে নতুন টার্মিনাল নির্মাণে অগ্রাধিকার পাচ্ছে স্থলভাগের টার্মিনাল। মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকায় এটি করা হবে। এটি হলে কম দামের সময় বাড়তি এলএনজি কিনে মজুদ করা যাবে। তবে এগুলো রাতারাতি করা যায় না, পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, ‘এখন আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কম। আর কিছুদিন পরই ইউরোপে শীতের প্রকোপ বেড়ে গেলে দাম বেড়ে যাবে। আমাদের স্থলভাগের টার্মিনাল থাকলে এখন কমদামে কিনে মজুদ করতে পারতাম। তাহলে শীতের সময়ে বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হতো না। চোখের সামনে দেখছি খরচ বেশি পড়ছে কে না চাইবে সাশ্রয়ী দাম নিশ্চিত করতে!’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান বলেন, ‘শিল্পে ব্যবহৃত ক্যাপটিভ বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। আমরা আর ১০ মেগাওয়াটের বেশি কোনো প্রকল্পে গ্যাস সংযোগ দেব না। এখন যেমন ক্যাপটিভ রয়েছে, সেগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ৫০ কূপ খনন প্রকল্পের পাশাপাশি ১০০ কূপ খনন প্রকল্পের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। আশা করছি, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন অনেক বাড়বে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, ‘উন্নয়ন কর্মকান্ড বাড়ানোর জন্য দুটি নতুন রিগ কেনা হচ্ছে। একটি রিগ কেনার প্রস্তাব খুব দ্রুতই একনেকে উঠবে। আরেকটির প্রাক-সমীক্ষা চলমান রয়েছে। এগুলো হলে কূপ খনন কার্যক্রম আরও দ্রুত করতে পারব। ডিসেম্বর মাসের মধ্যে পুরো ভোলা জেলার সিসমিক সার্ভে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, সেখানেও আমাদের মজুদ বৃদ্ধি পাবে।’

জাতীয় গ্রিডে ৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস : তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) নিয়ে একটি নিবন্ধ উপস্থাপন করেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব। তিনি বলেন, স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য তৈরি পিএসসির খসড়া জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে একটি নিবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ৫০টি কূপ সংস্কার, উন্নয়ন ও খননের প্রকল্পে ইতিমধ্যে ১৮টির কাজ শেষ হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে নতুন করে দিনে ৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। চারটি কূপের কাজ চলমান।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ১০০ কূপ প্রকল্পের আওতায় ৬৯টি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন করা হবে। এর মাধ্যমে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন আরও ৯৮৫ মিলিয়ন বাড়বে। আর ৩১ ওয়ার্কওভার থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন উৎপাদন বাড়বে। ১০০ কূপ থেকে ১৯টি কূপ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হলে ওই ১৯টি কূপ থেকে ২৭৭ মিলিয়ন গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া সেমিনারে পেট্রোবাংলার বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম তুলে ধরেন সংস্থাটির পরিচালক (পরিকল্পনা) মো. আবদুল মান্নান পাটওয়ারী।

সবচেয়ে বেশি বকেয়া বিদ্যুৎ খাতে : সেমিনারে পেট্রোবাংলার আর্থিক দিক তুলে ধরেন সংস্থাটির পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, গত অর্থবছরে পেট্রোবাংলার রাজস্ব আয় ৫৪ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, এর মধ্যে অর্ধেক বকেয়া। গত মে পর্যন্ত গ্যাস বিল বকেয়া ২৭ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। এটি ধীরে ধীরে কমে আসছে। ১৩-১৫ হাজার কোটিতে বকেয়া নেমে এলে সন্তোষজনক। সবচেয়ে বেশি বকেয়া বিদ্যুৎ খাতে ১৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। এরপর সার-কারখানায় বকেয়া আছে ৯৬৪ কোটি টাকা। তবে বিদেশি কোনো কোম্পানির কাছে বিল বকেয়া নেই পেট্রোবাংলার। সব বিল শোধ করা হয়ে গেছে।

প্রতি ইউনিট গ্যাস বিক্রিতে লোকসান ৪ টাকা : পেট্রোবাংলা বলছে, এলএনজি আমদানি শুরুর পর থেকে লোকসান শুরু হয় সংস্থাটির। প্রতিবছর সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিচ্ছে পেট্রোবাংলা। ২০১৮-১৯ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়, ওই বছর ভর্তুকি ছিল ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এরপর এলএনজি আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভর্তুকিও বাড়তে থাকে। গত অর্থবছরে তারা ভর্তুকি নিয়েছে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত পেট্রোবাংলা ভর্তুকি নিয়েছে ৩৬ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। পেট্রোবাংলার হিসাবে গত অর্থবছরে প্রতি ইউনিট গ্যাস সরবরাহে পেট্রোবাংলার খরচ হয়েছে ২৭ টাকা ৫৩ পয়সা। তারা বিক্রি করেছে ২২ টাকা ৯৩ পয়সায়। এর মানে প্রতি ইউনিটে লোকসান হয়েছে ৪ টাকা ৬০ পয়সা।

সেমিনারে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশের (এফইআরবি) সদস্যরা অংশ নেন। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) আলতাফ হোসেন, ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শামীম জাহাঙ্গীর, নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত