চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনার ভার বিদেশি কোম্পানি ডিপিওয়ার্ল্ডকে দেওয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, সেটা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) পরিচালনার ভার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কেন বিদেশি কোম্পানির কাছে দিতে চায়, এই মর্মে এখনো কেউ আইনি প্রক্রিয়ার দ্বারস্থ হয়নি ঠিকই, তবে চাপা উৎকণ্ঠা আছে অতীতে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা এবং পরিচালনায় থাকা ব্যক্তিদের মনে। কেউ আশঙ্কায় আছেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ার, কেউ আশঙ্কা করছেন বিদেশি কোম্পানির হাত ধরে জুয়ার কোম্পানির সারোগেট অংশগ্রহণের দরজা প্রশস্ত হবে। অন্যদিকে কেউ কেউ দেখছেন ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর আশা।
জন্মলগ্ন থেকেই নানান সমস্যা নিয়ে ১৩ বছরে ১১টা আসর পার করেছে বিপিএল। খেলোয়াড়দের পাওনা পরিশোধ করে না ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো, মানহীন বিদেশি খেলোয়াড় নিয়ে আসে, ঠিকমতো জার্সিটাও দেয় না এমন অনেক অভিযোগ যেমন তাদের আছে; তেমনি মানসম্মত উইকেট না দেওয়া, পক্ষপাতমূলক আম্পারিং, সূচিতে বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়া, ডিআরএস না রাখাসহ অনেক অভিযোগ তাদেরও আছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল তথা বিসিবির প্রতি। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের প্রধান হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে বিসিবির পরিচালক পদে থাকা মাহবুব আনাম দুটো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন, একটি খেলোয়াড়দের সঙ্গে এবং একটি গণমাধ্যমের অংশীজনদের সঙ্গে। অতীতে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক ছিলেন এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সঙ্গে কথা হয়েছে, কারও সঙ্গে বাকি আছে। এরই মধ্যে বিপিএল পরিচালনায় আন্তর্জাতিক স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগের আগ্রহপত্রও আহ্বান করেছে বিসিবি। আগ্রহপত্র জমা দিয়েছে অ্যাপেক্স স্পোর্টিং কনসাল্টিং, আইএমজি, রিয়াল ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড অ্যাবসলিউট লিজেন্ডস স্পোর্টস, দ্য আইপিজি গ্রুপ ও মাইন্ড ট্রি, ট্রানস্পোর্টস গ্রুপ। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল এখন তাদের আগ্রহপত্র যাচাই-বাছাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডেকে বিস্তারিত প্রস্তাব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা দেখতে চাইবে। তবে শোনা যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত আইএমজির সঙ্গেই চুক্তি করতে বেশি আগ্রহী বিসিবি, কারণ এই বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানটি আইএলটি ২০, আইপিএলসহ বেশ কিছু বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজনের পরিচালনা ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত, যার মধ্যে আছে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউএস ওপেন, উইম্বলডনসহ সার্ফিং, মোটরস্পোর্ট, গলফের মতো খেলার অনেক বড় বড় আসর। আইপিএলের সঙ্গে আইএমজির ১৩ বছরের চুক্তি শেষ হয় ২০২১ সালে। ২০০৭-০৮ মৌসুম থেকে ১০ বছরের চুক্তির পর ২০১৭ সালে সেই চুক্তি আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়িয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই), যদিও পরে দুই বছর বাকি ছিল, তারপরেও ২০২১ সালের ৮ জানুয়ারি দুপক্ষই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে। বিসিসিআই প্রাথমিক চুক্তিতে বছরে ২৭ কোটি রুপি দিত আইএমজিকে, দ্বিতীয় মেয়াদে সেটা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি বছর আরও ১২ কোটি রুপি করে আইএমজিকে দিতে হতো বিসিসিআইকে।
আইএমজি বা যেকোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বিপিএল পরিচালনার দায়িত্বভার দেওয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে পূর্বের ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকপক্ষদের মধ্যে। সবশেষ দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন ফরচুন বরিশালের মালিক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ আর ভারতের বাস্তবতা তো এক না। আমি তো আসলে পুরো ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছি না যে, কী বলব। আগে তো আমাকে বুঝতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান এলে আমরা কি অভিভাবকশূন্য হয়ে যাব? আগে তো কোনো সমস্যায় পড়লে বিসিবির কাছে যেতাম, এখন তাহলে কার কাছে যাব? পুরো বিষয়টা বুঝতে হবে।’ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে তার শঙ্কা, ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিলে তাদের হাত ধরে সারোগেট বেটিং কোম্পানিগুলো ঢুকতে পারে। অন্যান্য জায়গায় তো এসব প্রতিষ্ঠানগুলোই বিভিন্ন দলের স্পন্সর হচ্ছে।’ মিজানের অভিযোগ মিথ্যা নয়। আইএল টি ২০-এর অনেক দলের জার্সিতেই বেটিং কোম্পানির সারোগেট বিজ্ঞাপন আছে, যেমন সবশেষ আসরের চ্যাম্পিয়ন এমআই এমিরেটসের খেলোয়াড়দের বুকেই আছে পিনআপ ক্যাসিনো নামের অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইটের সারোগেট প্রতিষ্ঠান পিনআপ ক্রিকেটের বিজ্ঞাপন। আইপিএল দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মালিকানা একটি আন্তর্জাতিক অ্যালকোহল উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ডিয়াজিও স্পিরিটসের হাতে, যাদের উৎপাদিত একটি হুইস্কির নাম রয়্যাল চ্যালেঞ্জ। নতুন পরিচালনায় বিপিএলে অংশ নেওয়ার আগে শর্তগুলো ভালোভাবে জেনে তারপরই দল গোছানোর ভাবনা মিজানের, তবে তার আগে স্বচ্ছতা চান আর্থিক ব্যবস্থাপনার, ‘বিপিএলে দল নেওয়ার আগে আমাকে জানতে হবে আগামীতে আর্থিক বণ্টন কীভাবে হবে। এই লিগের রেভিনিউ মডেল কী হবে, কীভাবে লভ্যাংশ এবং সম্প্রচার স্বত্ব, টিকিট, এসবের আয় বণ্টন হবে, একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি লাভজনক হবে কি না, এসব ব্যাপারে পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকলে তাহলেই বিনিয়োগ আসবে।’
বিপিএলের আরেকটি সফল ফ্র্যাঞ্চাইজি রংপুর রাইডার্স। বসুন্ধরা গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই ফ্র্যাঞ্চাইজির টিম ডিরেক্টর শানিয়ান তানিম জানালেন, বিদেশি পরিচালনা নিয়ে তাদের আপত্তি নেই, তবে কয়েকটি ব্যাপারে তারা স্পষ্ট সিদ্ধান্ত চান, ‘আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবি থেকে এখনো ডাকেনি আলোচনার জন্য। তবে আমরা আগামীতে থাকতে চাই এবং রংপুর নামেই থাকতে চাই। বছর দুয়েক আগে আমাদের ঢাকা ফ্র্যাঞ্চাইজিটা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যেটা পরে নিউটেক্স গ্রুপ কিনেছিল। তবে আমরা রংপুর রাইডার্স নামেই থাকতে চাই, কারণ আমাদের একটা বৈশ্বিক পরিচিতি তৈরি হয়েছে, ফ্যানবেজ আছে। দেখেন বিপিএলের সেরা সময় ছিল ২০১৭-১৮ ওই সময়টা যখন সেরা ক্রিকেটাররা যেমন এবি ডি ভিলিয়ার্স, রাইলি রুশো, ডেভিড ওয়ার্নার, স্টিভেন স্মিথ, জস বাটলাররা খেলে গেছেন। তখন তো বিসিবিই বিপিএল চালিয়েছিল, বাইরের কোম্পানি লাগেনি। আসলে কয়েকটা ব্যাপারে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসতে হবে। টুর্নামেন্টটা কখন হবে, এই ক্যালেন্ডারটা ঠিক করা আর রিটেনশন পলিসিটা ঠিক করা। প্লেয়ার্স ড্রাফটটা পুরোই ভাগ্যের খেলা। দেশের প্লেয়ারদের নিলামের মাধ্যমে নেওয়াই ভালো। তাহলে প্রত্যেকে তাদের মূল্যটা বুঝবে। দলগুলোকে একটা নির্দিষ্ট বাজেট করে দেওয়া দরকার যে, এর বেশি তারা খরচ করতে পারবে না। এতে করে হয়তো রংপুরই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তবে দিনশেষে বিপিএলটা জমজমাট হবে।’
বিপিএলের অন্যতম প্রধান নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য স্বার্থের সংঘাত। নাজমুল হাসান পাপন ছিলেন বিসিবি সভাপতি, আবার বেক্সিমকোর এমডি। বিপিএলে বেক্সিমকোর দল ঢাকা ডায়নামাইটসের কোচ হতেন বিসিবির সাবেক পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন। এই দলের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিতে প্রভাবিত করা হতো আম্পায়ারদের, সূচিতে সুবিধাজনক সময় দেওয়া হতো তাদের বিদেশি খেলোয়াড়দের, প্রাপ্যতা অনুযায়ী এমন অনেক অভিযোগই সে সময় অনেক পক্ষ থেকে এসেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার ভার দিলে কি এসব সমস্যা দূর হবে? এই প্রশ্নে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন, ‘দিনশেষে তো সেই প্রতিষ্ঠানও বিসিবিকেই রিপোর্ট করবে। এখানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে বিসিবিকেই। আইপিএলে সব দলের হোম ভেন্যু থাকে। তারা সেই মাঠের গ্রাউন্ডস রাইটস, টিকিট এসব থেকে টাকা পায়, তারা জানে ওই ভেন্যুতে তারা কয়টা ম্যাচ খেলবে। বিপিএলে হোম ভেন্যু বলে কিছু নেই, সবাই টাকার সমান ভাগই পেয়েছে আগেরবার, এর আগে তো ভাগই পায়নি। ধরেন সিলেটে দল পাঁচটি ম্যাচ খেললে রংপুর চারটি খেলবে, এতে করে কোনো বাড়তি লাভ হয় না। এসব তো আইপিএলে নেই।’ তার ভাষায় বিসিবি আসলে ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি করে না, লিজ দেয়। আইপিএল বা পিএসএলে যেমন ফ্র্যাঞ্চাইজি শুরুতে যারা কিনেছে তাদেরই মালিকানায়, তারা সেই স্বত্ব আবার বিক্রি করতে পারে বা শেয়ার বিক্রি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়ে। কিন্তু বিপিএলে দল কিনলে এরপর খালি হাতে ফিরতে হয়, কোনো রি-সেল ভ্যালু নেই। নতুন করে যদি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিসিবি ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি করে তাহলে এই ব্যাপারগুলোও নজরে রাখা দরকার বলেই জানিয়েছেন তিনি।
সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল যখন বিসিবি সভাপতি ছিলেন, তখন ২০১২ সালে শুরু হয়েছিল বিপিএল। প্রথম দুই আসরের দলগুলোর অনিয়ম, ম্যাচ গড়াপেটা, বকেয়া পাওনাসহ নানান কর্মকা-ে বিসিবি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরেই নাজমুল হাসান বলেছিলেন, ‘বিপিএল একটা পেইন (যন্ত্রণা)।’ সেই যন্ত্রণার উপশম তিনি বিসিবির সবচেয়ে বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা সভাপতি হিসেবেও করে যেতে পারেননি। দেশের ডাক্তাররা না পারলে রোগীকে বিদেশে নেওয়ার মতো বিপিএলের ‘চিকিৎসা’ করতে এখন বিদেশের ধ্বনন্তরী আনতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকলে, ভূত তাড়াবে কে? তাই আন্তর্জাতিক সংস্থার নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার উন্নয়নে বিসিবির সদিচ্ছাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন সংশ্লিষ্টরা, না হলে নতুন মোড়কে সেই পুরাতন পণ্যই সামনে আসবে ঘুরেফিরে।
https://www.deshrupantor.com/610620
সমর্থকদের দোষে পিএসজিকে মোটা অঙ্কের জরিমানা
পাকিস্তানি জার্সি ঢাকতে বলায় ক্ষমা চাইল ল্যাঙ্কাশায়ার
বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি পরে জোড়া গোল করলেন ইয়ামাল
ভেঙ্কটেশ আইয়ারকে ছেড়ে লোকেশ রাহুলকে পেতে চায় নাইট রাইডার্স
গাভাস্কারকে ছাড়িয়ে ব্র্যাডম্যানের বিশ্বরেকর্ড ভাঙার পথে শুবমান