টেস্টে 'ফলস থ্রি' কাকতাল না ভবিষ্যৎ

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৪১ পিএম

ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে কুলীন সংস্করণ টেস্ট। সেরাদের সেরা না হলে এই ফরম্যাটে টিকে থাকা বড় দুষ্কর। প্রতিনিয়ত বাঘা বাঘা ক্রিকেটাররা নিজেদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এই সংস্করণে। বৈশ্বায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ কিংবা অর্থের মোহ সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে এখনো এই একবিংশ শতকে টেস্ট ক্রিকেটকেই চোখ বুজে ‘সেরা’র তকমা দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না কোনো ক্রিকেট পাগল। ১৮৭৭ সালে শুরু হওয়ার পর নানা বাঁক, নিয়ম, কৌশল বদলের মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে এসে দাঁড়িয়েছে আজকের পর্যায়ে। পরিবর্তনের এই ঢেউয়ে নতুন সংযোজন ব্যাটিং অর্ডারে ফলস নাম্বার থ্রি। 

টেস্টে তিন ও চার নম্বরে ব্যাটিংয়ে আসেন কোনো দলের সেরা ক্ল্যাসিক ব্যাটসম্যানরা। অধুনা সময় অব্দি এটিই ছিল টেস্ট ব্যাটিংয়ের চিরাচরিত প্রথা। বিশ্বের সর্বসেরা ডন ব্র্যাডম্যান থেকে শুরু করে ভিভ রিচার্ডস, ব্রায়ান লারা, জ্যাক ক্যালিস, রাহুল দ্রাবিড়, রিকি পন্টিং, ইউনিস খান, কুমার সাঙ্গাকারাদের মতো কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানরা তিনে ব্যাটিং করেই হয়েছেন জগদ্বিখ্যাত। তবে সময়ের তালে পরিবর্তন যেমন অনস্বীকার্য। তেমনি চিরায়ত এই প্রথায়ও দেখা যাচ্ছে বদল। টেস্টে তিন নম্বরে ব্যাটিং করতে আসছেন এমন কেউ যিনি হয়তো পুরোদস্তুর ব্যাটারই নন।

সবশেষ জুনে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে প্রথমবার ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয়েছিল আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। এমন মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতার ফাইনালে বিশ্বের সেরা দুটি দল তাদের সেরা একাদশ নামাবে – সেটাই প্রত্যাশিত। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী দল গঠিত হলেও, সবটা কি ঠিক ছিল? অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তিন নম্বরে নামা ক্যামেরন গ্রিন মূলত একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডার। তিনি এর আগে কখনো তিন নম্বরে নামেননি এবং এই ফাইনালের আগে তার ব্যাটিং গড় ৩৬। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে একই ভূমিকায় থাকা উইয়ান মুল্ডার তিন নম্বরে ব্যাট করেছিলেন মাত্র দুইবার– সেখানেও তার রান ছিল ১৫ ও ৫। গড় ২৩ এর নিচে এবং তিনিও একজন পেসার। বিশ্বের সেরা দুটি টেস্ট দল ফাইনালের মঞ্চে তিন নম্বরে একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডারকে নামিয়েছে। এটি যদি অস্বাভাবিক মনে না হয়, তার মানে হয়তো তিন নম্বর পজিশন এখন আর অতটা মর্যাদাপূর্ণ নয়।

ইংল্যান্ডের ওলি পোপ তিন নম্বরে ব্যাট করে বিদেশে গড় তুলেছেন ৩৪.১০। ভারতের হয়ে গত দশ টেস্টে ছয়জন তিন নম্বরে ব্যাট করেছেন– তাদের মধ্যে একজন অভিষিক্ত সাই সুদর্শন আরেক জন ৮ বছর পর ফেরা করুন নায়ার। পাকিস্তানও একাধিক বিকল্প ব্যবহার করেছে, কিন্তু আজহার আলি অবসর নেওয়ার পর থেকে তিন নম্বর থেকে এসেছে মাত্র একটি শতরান। উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে আরও। তবে মূল বিষয় হলো– এখনকার টেস্ট ক্রিকেটে কেন উইলিয়ামসনের মতো একজন তিন নম্বরের ব্যাটার থাকা ব্যতিক্রম, সাধারণ নয়। অনেক আগেই তিন নম্বর পজিশন ছেড়ে দিয়েছেন জো রুট এবং স্টিভেন স্মিথ।

তিন নম্বর কোনো সাধারণ পজিশন নয়। ডন ব্র্যাডম্যান, ওয়ালি হ্যামন্ড এবং জর্জ হেডলি এই পজিশনে ব্যাট করতেন। ডেভিড গাওয়ার, রিকি পন্টিং, কুমার সাঙ্গাকারা, রাহুল দ্রাবিড়, চেতেশ্বর পূজারা, জনাথন ট্রট এবং ফর্ম হারানোর আগ পর্যন্ত মারনাশ লাবুশেন তিন নম্বর পজিশনটি শক্তভাবে ধরে রেখেছিলেন। ভিভ রিচার্ডস, ব্রায়ান লারা, জ্যাক ক্যালিস, ইউনিস খান– তারাও তিন নম্বরে ব্যাট করতেন। তাদের সরে যাওয়ার পর এই জায়গা নিয়েছিলেন রিচি রিচার্ডসন, রামনরেশ সারওয়ান, হাশিম আমলা, আজহার আলি– যারা যথেষ্ট মানসম্পন্ন ব্যাটার ছিলেন এবং দেশের হয়ে হাজার হাজার রান করেছেন। তাহলে কবে থেকে এই পজিশনে বিশেষায়িত ব্যাটারদের বদল করা শুরু হলো।

২০১৮ সাল থেকে এই পরিবর্তনের শুরু। কারণ নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন, তবে জোর সম্ভাবনার মধ্যে রয়েছে পিচের চরিত্র বদলানো কিংবা বা পেসারদের ‘ওবল-সিম’ বলের দক্ষতা বাড়া। ওই বছর পেসারদের গড় ছিল ২৫.৩৯। যা ১৯৫৬ সালের পর সবচেয়ে সেরা। এবং এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। ২০১৯ সালে পেসারদের গড় ছিল ২৬.৩৬। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সাল বাদ দিলে যা ১৯৮১ সালের পর সেরা। একই বছর চালু হয় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। সেরা দলগুলো দ্রুত বুঝে যায় যে ড্র (৪ পয়েন্ট) ও হার (০ পয়েন্ট) এর মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি নয়, বিশেষ করে হোম ম্যাচে। তাই ড্র এড়াতে বা জয় নিশ্চিত করতে ঘরের মাঠে বোলিং সহায়ক উইকেটের দিকে ঝুঁকতে থাকে টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো। ফলে পেসারদের পাশাপাশি স্পিনারদেরও বোলিং গড় কমতে থাকে। গত ২৫ বছরে বোলারদের বছরান্তে সেরা সাত গড়ের মধ্যে ছয়টিই এসেছে ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। আর এই সময়কালেই কোনো দেশের শীর্ষ ছয় ব্যাটারদের গড় ২০০০ থেকে ২০১৭ সালের তুলনায় কমে গেছে অপ্রত্যাশিতভাবে। নতুন বলে পেসারদের আধিপত্যে ওপেনারদের গড় কমে যাওয়া অনুমানযোগ্য। তবে আশ্চর্যজনকভাবে সবচেয়ে বেশি কমেছে তিন নম্বর ব্যাটারের গড়। ২০১৭ পর্যন্ত যা ছিল ৪২.৫৮ অথচ এর পর ১৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪.৫৫ এ।

পরিসংখ্যানে তাকালে এই গড় পতনের একটি বড় কারণ চোখে ধরা পড়ে। ২০০০-২০১৭ সালের মধ্যে একটি ইনিংসের গড় উদ্বোধনী জুটি স্থায়ী হতো ৩৮ বল। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা নেমে এসেছে ৩২-এ, অর্থাৎ পাক্কা এক ওভার কম। সংখ্যায় এটিকে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু এখানেও পরিসংখ্যানে চোখ বুলালে দেখা যায় ম্যালকম মার্শাল গড়ে প্রতি ৪৭ বল পরপর উইকেট নিতেন, সেখানে জাসপ্রিত বুমরা ৪২ বল পর পর, কাগিসো রাবাদা ৩৯, প্যাট কামিন্স ৪৬।

ফলে তিন নম্বর ব্যাটারকে নতুন বলের মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেক বেশি। ওপেনাররা এতে অভ্যস্ত, কিন্তু তিন নম্বরে এসে নতুন বল সামলানো কঠিন কাজ। দলগুলো তাই নতুন কৌশল নিয়েছে। গ্রিন ও মুল্ডার বোলিংয়েও অবদান রাখেন। তারা যথাক্রমে দলের সেরা ব্যাটার স্মিথ ও টেম্বা বাভুমার আগে ব্যাট করেন। ইংল্যান্ডও একসময় মইন আলিকে তিন নম্বরে ব্যবহার করেছে। ২০২৩ অ্যাশেজে লিডসে ২৫১ রান তাড়া করতে গিয়ে মইন তিন নম্বরে উঠে আসেন, যাতে রুট, ব্রুক, স্টোকস ও বেয়ারস্টোর মতো ব্যাটাররা পুরনো বলে স্বাভাবিক ব্যাটিং করতে পারে। মইন বলেছিলেন, ‘আমি যদি অন্তত ১০ ওভার ব্যাট করে নতুন বলের কঠিনতা পেরিয়ে যেতে পারি, তাহলে পরের ব্যাটারদের জন্য সহজ হবে... যদি আমি চার ইনিংসে একবার সফল হই, আর বাকি ইনিংসে কিছুটা অবদান রাখি, তাহলেও কাজটা ঠিকঠাকই হয়েছে।’ এই ভূমিকা অনেকটা ‘নাইটওয়াচম্যান’-এর মতো বিপদ এড়ানো কৌশল। দলের সেরা ব্যাটারদের নতুন বল থেকে দূরে রাখা যতটা সম্ভব। ২০২৩ সালে দ্য টেলিগ্রাফের উইল ম্যাকফারসন মইনের এই ভূমিকার নামকরণ করে ‘ফলস থ্রি’।

অনেক দল এখন পাঁচ নম্বরে দলের সবচেয়ে আগ্রাসী ব্যাটারকে ব্যবহার করে। ২০২৪ সাল থেকে হ্যারি ব্রুক (৮৪), ট্রাভিস হেড (৭৮), রিশভ পান্ত (৭৪), কামিন্দু মেন্ডিস (৬৪) প্রত্যেকেই বেশি স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করেছেন। তিন ও চার নম্বর চিরকালই টেস্টের সেরা মিডল অর্ডার পজিশন হলেও এখন বেশিরভাগ দল তাদের সেরা ব্যাটারদের চার ও পাঁচে নামায়। কারণ সেখানে তারা পুরনো বলে আরও স্বাধীনভাবে খেলতে পারেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়– এটি কেবলই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে ভবিষ্যৎ বিবেচনায় কারোর মস্তিষ্কপ্রসূত গূঢ় কোনো পরিকল্পনা।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত