গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনকালের পর নতুন সরকারের জন্য শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, আন্তর্জাতিক মহলে পরিস্থিতির গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে এ সরকারের স্বীকৃতি আদায় ও গণঅভ্যুত্থানের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য করে তোলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, ঋতসহায়তা অক্ষুন্ন রাখা এবং বিদেশি সহযোগিতায় চলমান ছোট-বড় প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখাও ছিল অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি, চলমান রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর অগ্রগতি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নির্বাচনী অনিশ্চয়তার পটভূমিতে গঠিত এই অন্তর্বর্তী সরকারের কাঁধে ছিল তিনটি অগ্রাধিকারভিত্তিক দায়িত্ব : একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মহলে রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কূটনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা। এ সময় বিশ্ব রাজনীতিতে বহু পরিবর্তন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য প্রতিযোগিতা, বৈশ্বীক মুদ্রাস্ফীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে সরকারকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত এক বছরে সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যের ক্ষেত্রে মোটাদাগে কোনো বিষয় চোখে না পড়লেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যনীতি অন্যতম সফল কূটনীতির উদাহরণ। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করেছে, যেখানে ভারত পেয়েছে ২৫ এবং পাকিস্তান ১৯ শতাংশ। এর ফলে তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিজিএমইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ১ মাসে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার বৃদ্ধি পেয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবীর মনে করেন, এক বছরে এটি সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য। অনেক বড় দেশও এ ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি। তিনি বলেন, সরকার লবিংয়ের জন্য বিশেষ দূত নিয়োগ করেছে, যিনি মার্কিন সিনেট, বাণিজ্য বিভাগ এবং ডায়াসপোরা কমিউনিটির সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন। ‘লিগ্যাল স্ট্যান্ডিং অব ডেমোক্রেসি ট্রানজিশন’ শীর্ষক বিশেষ বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো হয়। ধারাবাহিক আলোচনার ফলে বাংলাদেশ পাল্টা শুল্কে সুবিধা পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের আরেকটি সাফল্য হলো ‘টাইগার শার্ক ২০২৫’। এটি প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে অভূতপূর্ব সমন্বয়ের উদাহরণ। ‘টাইগার শার্ক’ মহড়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বে একটি ঐতিহাসিক মোড়। এতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী একযোগে অংশগ্রহণ করে। ইনফ্যান্ট্রি রেইড, মেডিকেল ক্যাম্প এবং দুর্যোগ সহনশীলতা অনুশীলন অনুষ্ঠিত হয়। এ মহড়ায় ৫০০ মার্কিন সেনাসদস্য অংশ নেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের প্রাধান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কোয়াড সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশকে ‘স্ট্যাবিলাইজিং পার্টনার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কূটনৈতিক আরেকটি সাফল্য হলো মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার আবার উন্মুক্তকরণ। এ বছরের মে মাসে মালয়েশিয়ার সরকার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার আংশিকভাবে খুলে দেয়। এর মাধ্যমে কনস্ট্রাকশন, টুরিজম, পরিষেবা এবং কৃষি খাতে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার শ্রমিক নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বোয়েসেলের মাধ্যমে ‘গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট’ চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানব পাচারবিরোধী কমিটিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখাও ছিল একটি চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সরকার সফল হয়েছে। এ বছর নতুন দুটি মিশনে (ডিআর কঙ্গো ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক) ৪ হাজার ২০০ শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের স্ট্যান্ডিং অর্ডার রিভিউতে বাংলাদেশ শীর্ষ তিন অবদানকারী দেশের মধ্যে অবস্থান ধরে রেখেছে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা ‘পিস ক্যাম্প অ্যানুয়াল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছে। এ ছাড়া এ সরকার বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, তিউনিসিয়া এবং সার্বিয়ার সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও বন্ধুত্ব পুনঃস্থাপন করেছে। আফ্রিকার রুয়ান্ডা, ঘানা এবং কেনিয়ায় নতুন ট্রেড মিশন চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে, কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের কিছু কূটনৈতিক ব্যর্থতাও রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো এক বছরেও ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে না পারা। সরকারের দায়িত্বশীলদের ভারতবিরোধী সমালোচনা সম্পর্ককে আরও শীতল করে তুলেছে। এর বিপরীতে কোনো শক্তিশালী মিত্র তৈরি করতে পারেনি সরকার। তিস্তা এবং সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে ভারতকে বারবার বার্তা দেওয়া হলেও কোনো চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। বিগত সময়ে ভারত ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য থাকলেও গত এক বছরে তা বজায় রাখতে পারেনি সরকার। এ সময় ভারতের সঙ্গে কোনো দ্বিপক্ষীয় সফর হয়নি। তিস্তা ব্যারাজ ও সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এ ছাড়া সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জোরালো বক্তব্য দিলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। চীনের মধ্যস্থতায় পুনর্বাসনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। কক্সবাজারে মানবিক সহায়তা তহবিলে ২০ শতাংশ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ঘোষণা দেওয়ার পাঁচ মাস পরও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। গত পাঁচ মাসে মিয়ানমারের জান্তা সরকার আরও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিককে বলপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশ করিয়েছে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করাও সম্ভব হয়নি। ফলে এই প্রক্রিয়া এখন ঝুলে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে একটি বিশেষ সম্মেলন হবে। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘ প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্টরা অংশ নেবেন। সম্মেলন উদ্বোধন করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এ ছাড়া আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা, আন্তর্জাতিক শরণার্থী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ অধিবেশন হবে। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ভারত ও জাপান ‘ডুয়েল ইউজ ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
