খাদের কিনারের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫, ০৮:৪৮ এএম

গত বছরের জুলাইতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ, বিনিয়োগে ছিল স্থবিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছিল। ফলে আমাদানি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। টাকার বিনিময় হার খুব দ্রুত অবনমন হচ্ছিল। সে জন্য ঋণ পরিশোধের দায়ভার ও আমদানি দায় ক্রমান্বয়ে বাড়ছিল। এমন পরিস্থিতিতে অনেক মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছিল। আয়ের বৈষম্যও অব্যাহতভাবে বাড়ছিল। বিশেষ করে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা কাজ পেতে সমস্যায় পড়ছিল। ছাত্রজনতার ক্ষোভের একটি বড় কারণ ছিল সেটি। এ ছাড়া সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতিও ক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল। কারণ এর ফলে সাধারণ মানুষের সরকারি বিভিন্ন সেবাপ্রাপ্তি বিঘিœত হচ্ছিল। এ রকম একটি অবস্থায় ছাত্রজনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।

ওই ঘটনার পর এরই মধ্যে এক  বছর পেরিয়ে গেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার নানা ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। তবে এর সবক্ষেত্রে সফলতা আসেনি। তা সত্ত্বেও বিগত সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতি যে খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল, সেখান থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ ছিল চোখে পড়ার মতো।

সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কয়েকটি বড় জায়গায় সংস্কার আনার চেষ্টা করে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্যাংক খাত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। আর ক্ষমতাচ্যুতির আগে আগে তারা জানিয়েছিল যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ হিসাব যে সঠিক নয়, সে বিষয়ে মোটামুটি ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল। অনেক ব্যাংকই খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে রাখত। কিন্তু সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার বিষয়ে সরকার ভূমিকা রেখেছে। ফলে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্পষ্টতা আনা হয়েছে।

এর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনের বিষয়ে সরকার নজর দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বের বিষয়টি সরকার অনুধাবন করেছে। সে অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নানা ধরনের শৃঙ্খলামূলক উদ্যোগ নেওয়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন রোধ করার পাশাপাশি মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া আমদানির ওপর বিগত সরকার যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, মুদ্রা পাচার রোধ করার ফলে সেটি আর এখন করা লাগছে না। আর সরকারের প্রতি প্রবাসীদের আস্থার ফলে বৈদেশিক রেমিট্যান্স ৩০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। যা রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

এ ছাড়া সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন সেবার ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে মানুষ সহজে সেবা পেতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন সুবিধাদি সঠিক ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

তবে নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও কিছু নেতিবাচক বিষয়ও আছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিগত সরকারের নানা অনিয়ম চিহ্নিত করে শ্বেতপত্র প্রকাশের জন্য অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল যে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। কিন্তু সেই অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। তাছাড়া বিগত সরকারের একটি বড় ত্রুটি ছিল বিভ্রান্তিকর তথ্য-উপাত্ত প্রদান। বিশেষ করে মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, জনসংখ্যার পরিসংখ্যান, মাথাপিছু জিডিপি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য প্রমাণের জন্য ভ্রান্ত পরিসংখ্যান দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানও উপাত্তের সঠিকতা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন তুলেছে। এসব বিষয়ে শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিগত দিনের পরিসংখ্যানের ত্রুটি উদঘাটনে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়। কারণে যেসব পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত ছিল না। এর পরিবর্তে নতুন উন্নয়ন এজেন্ডা প্রণয়নের জন্য একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য শতাধিক সুপারিশ করে। কিন্তু সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

দেশের অর্থনীতির একটি বড় সমস্যা হচ্ছে নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আমলেও তেমন অগ্রগতি হয়নি। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কম থাকার ফলে বাংলাদেশ একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব বাড়ানো না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ঋণের ফাঁদে পড়ে যাবে। কেননা বিগত সরকার ১৮ লাখ কোটি টাকার ঋণ রেখে গেছে। আর বাজেট বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবছরই ২ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে। কিন্তু ঋণ পরিশোধের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে শক্তিশালী অবস্থা সৃষ্টি করা যায়নি। এ জন্য এনবিআরে কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই।

এ ছাড়া যে কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে কোটাবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, সেই কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট ঘোষণা করেছে, সেখানেও কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে নতুন কর্মসংস্থানের ওপর। এ ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যা বিনিয়োগ কম হওয়ার অন্যতম কারণ। কর্মসংস্থানের বড় একটি ক্ষেত্রে হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন (এডিপি)। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ যাবৎ কালের সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও কমানো হয়েছে এডিপির আকার। এটিও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে বিগত সরকারের সময়ে নির্বিচারে নানা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ার ফলে দুর্নীতি বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সরকার অনেক যাচাই-বাছাই করে প্রকল্প গ্রহণের চেষ্টা করছে। এর ফলে এডিপি বাস্তবায়ন কম হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। সে সময় অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার বেশ কঠিন বিষয় ছিল। তারপরও সরকার বেশকিছু ক্ষেত্রে সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করে তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু সবক্ষেত্রে যে সরকার সফলতা দেখাতে পেরেছে তেমনটি নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা সমাধানের জন্য এক বছর সময় যথেষ্ট নয়। সেটা আমরা বুঝি। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার একটি ব্যবধান দেখা দিয়েছে। দুর্নীতি দমন, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা সরবরাহে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে হবে এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকার যাতে এসব উদ্যোগ অব্যাহত রাখে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত