অভ্যুত্থান, বিপ্লব ইত্যাদি শব্দের কুঠরিতে রাজনীতির অঙ্গনে ব্যস্ত নেতাকর্মীদের ভাবনা আটকে থাকলেও, জনস্তরে প্রধানতম বিষয় একটাই। জীবনযাপনের কষ্ট কতটা বাড়ল, কতটা কমল, এই হচ্ছে জনমানুষের একক কিংবা যৌথ ভাবনা। পরিবার ও সমাজ যখন এ বিষয়ে দুর্ভাবনামুক্ত তখন জনমন থাকে স্বস্তিতে। আর এর ব্যত্যয়ে যত অস্বস্তি, যত বিরক্তি ও ক্ষোভ। মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরের শেষ পৃষ্ঠায় ‘খাদের কিনারের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনে গত আগস্ট থেকে চলতি সময় পর্যন্ত এক বছরের অর্থনীতির হালচাল বিধৃত হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে প্রাসঙ্গিক অনেক বিষয়ের প্রতিই জনদৃষ্টি নিবদ্ধ হতে পারে। সেখানে বিগত সরকারের আমলে অর্থনীতির চিত্র জনসমক্ষে উপস্থাপনে অতীতে যে অসততার আশ্রয় নেওয়া হতো, তা উল্লেখের পাশাপাশি খাদের কিনারে নিপতিত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, জনসংখ্যার পরিসংখ্যান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিগত সরকারের তথ্য-উপাত্তের ফাঁকি-লুকোচুরির বিষয়গুলো সমাজের উপরিস্তরে আগে নীরব কথোপকথনে স্থান পেলেও দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের শ্বেতপত্রে তার প্রকাশে দেশ জুড়ে সরব আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তথ্য-উপাত্তের এই লুকোচুরির বিষয়ে বিরোধী রাজনীতির মঞ্চ থেকেও বিগত আমলে আলোকপাত করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। ওই অসততার ওপর নিবদ্ধ না করে আমরা দেখব, বছরের পর বছর রাষ্ট্রের চলার পথ রচনায় বর্তমান সরকার বিগত আমলের ব্যর্থতার আলোকে কী পথনির্দেশ নির্ধারণ করছে।
আমাদের ক্ষুদ্র দেশ। লোকসংখ্যার ভার ক্রমবর্ধমান। কর্মসংস্থান আমাদের জন্য এক নিরন্তর সমস্যা। জনবৃদ্ধির সঙ্গে সমঞ্জস খাদ্যোৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধিও এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসা-ওষুধপত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, পণ্য ও জনচলাচল ইত্যাদি যত মৌলিক সামাজিক চাহিদা পূরণ কর্তব্য। তাই অর্থনীতির জটিল সব সংখ্যা আর সূচক বিষয়ে বিতর্ক বিশ্লেষণ গবেষকদের একান্ত বিষয় হিসেবে স্থান নিক। আমরা সাধারণের সুলভ খাবারের ব্যবস্থাসহ পাঁচ মৌল চাহিদা পূরণে সমাসীন সরকার সমীপে আমাদের কথাগুলো তুলে ধরি। বছর অতিক্রান্ত। সরকার এখন পরিণত এবং সমস্যাতাড়িত দেশ, সমাজ, জনসাধারণ বিষয়ে সম্যক উপলব্ধিতে ঋদ্ধ। সহজ এবং সাধারণ বিবেচনায় আমরা বুঝি, রাষ্ট্রের জনমুখী ব্যয়ে জনসাধারণের হয় আয়। আবার জনসাধারণের দিক থেকে যত ব্যয় সাধিত হয়, রাষ্ট্রের সেখান থেকেই আসে আয়। প্রথমেই বলি, এই দ্বিমুখী আয়-ব্যয়ের আর্থিক কার্যক্রম ধারা যত বেশি সচল, রাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজ তত বেশি প্রাণবন্ত এবং সুস্থিত। এই সাধারণ সূত্রকেই ভিত্তি হিসেবে নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রের চলার ধারাবাহিকতা নির্দিষ্ট হওয়া দরকার। এখানে কৃষির কথা তুললে, বিশাল জনগোষ্ঠীর কৃষিজ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার এবং কৃষির আওতা ক্রমবৃদ্ধির প্রসঙ্গ আসে উৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদে। একইসঙ্গে কৃষির বৈচিত্র্য সাধনে রাষ্ট্র-উদ্যোগ, প্রণোদনা দান, গবেষণালব্ধ নতুন ধরন কৃষিতে চালুকরণ ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়। আবার শিল্প-বাণিজ্য খাতের ব্যাপ্তি, বিস্তৃতি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য সাধনের প্রসঙ্গ তুললেও রাষ্ট্র-উদ্যোগ ও আনুকূল্যদানের বিষয় এসে যায়। ক্রমবৃদ্ধিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃষি-শিল্প-বাণিজ্যের পাশাপাশি অপরাপর ক্ষেত্রের প্রসঙ্গেও দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হয়।
বৈদেশিক রিজার্ভ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ইত্যাদি সংবাদ শিরোনাম আমাদের জনজীবনে আশার সঞ্চার যেমন ঘটায় তেমনি মানুষকে নবতর আকাক্সক্ষায় জাগ্রত করে। সে আকাক্সক্ষা আয় বৃদ্ধির, সমৃদ্ধি অর্জনের এবং উন্নত জীবন নির্বাহের। অর্থাৎ আমাদের মৌল সব চাহিদার পূরণ যেমন চাই, তেমনি সমৃদ্ধতর জীবনের আকাক্সক্ষা পূরণে রাষ্ট্রের করণীয়গুলোও নির্দিষ্ট হওয়া চাই। বিগত সরকারের জমানায় শেষ ক’টি বছরে অর্থনীতির পুরো ক্ষেত্র ছিল একেবারেই নিয়মনীতিহীন, খেয়ালখুশিমাফিক, ব্যাংকের অর্থ লোপাট নির্ভর। ফলে শহরাঞ্চলে এবং গঞ্জে কর্মসংস্থান হয়ে পড়েছিল সংকুচিত। আবার অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যবৃদ্ধির দাপটে কৃষিপণ্যের উচ্চমূল্যের সুযোগ-সুবিধা সাধারণ কৃষক যখন পায়নি তখন কৃষি থেকে দূরের ক্রেতাসাধারণ ওই মূল্যবৃদ্ধির চাপে হয়েছে ন্যুব্জপৃষ্ঠ। রাজনীতি-নির্বাচন-সংবিধান সংস্কার নিয়ে যত কথা যত বিতর্ক হয়েছে বছর জুড়ে, তার সিকি অংশও যদি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নিয়ে হতো তবে দেশ হতো উপকৃত, মানুষের দৃষ্টিদিগন্ত আলোকিত হতো এবং এতে ভবিষ্যৎ নাগরিক জীবনের চলার পথ হতো মসৃণতর। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের দেশকে একটি উন্নয়নশীল জনপদ হিসেবে পরিচালিত করার জন্য যে সামগ্রিক উদ্যম উদ্যোগ উদ্ভাবন এবং উল্লম্ফন ব্যবস্থা দরকার, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। অথচ বিগত বিপ্লব সব পশ্চাৎপদতার অতীতাশ্রয়ী ব্যবস্থা ঝেড়ে ফেলে নবোদ্যমে যাত্রার তাগিদই রেখেছিল আমাদের সামনে।
