ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা উপত্যকা সম্পূর্ণ দখলের পরিকল্পনা ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। গত সোমবার এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট, চ্যানেল ১২, ওয়াইনেট ও আই২৪নিউজ। তবে, নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে গাজার যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে প্রায় ৬০০ সাবেক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানরাও আছেন। এদিকে, ‘ফিলিস্তিন ২’ নামের হাইপারসনিক ব্যালিসটিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৩৬ ত্রাণ প্রত্যাশীসহ আরও অন্তত ৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর সম্পূর্ণ গাজা দখলের এই সিদ্ধান্তের ফলে গাজা উপত্যকাজুড়ে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণ করবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এর মধ্যে হামাসের হাতে জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের যেসব এলাকায় রাখা হয়েছে, সেগুলোও থাকবে। নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে চ্যানেল ১২-এর প্রধান রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমিত সেগা বলেছেন, এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশের পর নেতানিয়াহুর এমন পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পরিকল্পনাটি রুখে দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে নেতানিয়াহুর কার্যালয় আলজাজিরার অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েল সরকার যখন এমন পরিকল্পনা করছে, তার বিপরীতে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে গাজার যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে প্রায় ৬০০ সাবেক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ট্রাম্পকে পাঠানো চিঠিতে ওই কর্মকর্তারা বলেন, আমাদের পেশাদারি মূল্যায়ন হলো, হামাস এখন আর ইসরায়েলের প্রতি কোনো ধরনের কৌশলগত হুমকি সৃষ্টি করছে না। সাবেক কর্মকর্তারা চিঠিতে ট্রাম্পের উদ্দেশে বলেন, বেশিরভাগ ইসরায়েলি আপনার ওপর ভরসা করে এবং তাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী (বেনিয়ামিন) নেতানিয়াহু ও তার সরকারকে সঠিক পথে পরিচালনা করার ক্ষমতা আপনার আছে। এই যুদ্ধের অবসান ঘটান, জিম্মিদের ফিরিয়ে আনুন এবং সবার দুর্ভোগ দূর করুন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠানো খোলা চিঠিতে সবার দুর্ভোগের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক প্রধান তামির পারদো, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেটের সাবেক প্রধান আমি আয়ালন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালনসহ আরও অনেকেই।
আয়ালন বলেন, শুরুতে এটা শুধু একটি যুদ্ধ ছিল, প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ। এরপর আমরা সব সামরিক লক্ষ্য পূরণ করলাম। তারপর থেকে এটাকে আর শুধু যুদ্ধ বলা যায় না। সাবেক কর্মকর্তারা কমান্ডার্স ফর ইসরায়েলস সিকিউরিটি (সিআইএস) গ্রুপ নামের সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে। তারা সরকারকে এর আগেও জিম্মিদের মুক্তির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
এদিকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা, তেল আবিবের প্রধান বিমানবন্দরে বেন গুরিয়নে ‘ফিলিস্তিন ২’ নামের হাইপারসনিক ব্যালিসটিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক ভিডিও বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক্সে পোস্ট করে ওই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি জানায়। আর্মি রিকগনিশন ডটকম ও ওয়াইনেটনিউজ ডটকম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কারিগরি সহায়তায় ইয়েমেনের হুতিরা ফিলিস্তিন ২ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রে তরল জ্বালানির বদলে সলিড ফুয়েল (কঠিন জ্বালানি) ব্যবহার হয়। এর পাল্লা দুই হাজার ১৫০ কিলোমিটার। এটি ৫০০ কেজি ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। ইরানের ফাতেহ-১১০ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে অত্যাধুনিক গাইডেন্স, প্রপালশান ও দিক বদলের প্রযুক্তি রয়েছে। এটি সহজেই ইসরায়েলের আয়রন ডোমের মতো সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৩৬ ত্রাণ প্রত্যাশীসহ আরও অন্তত ৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে উপত্যকাটিতে মোট প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৯০০ জনে। হামলার পাশাপাশি খাবার ও পানির সংকটে নাজেহাল গাজাবাসী। ইসরায়েলি বোমা হামলা ও সাহায্যের অভাবে প্রতিদিন গড়ে ২৮ শিশু মারা যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি না হলে, উপত্যকাটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে জানিয়েছে সাহায্য সংস্থাগুলো।
