জীবনের দীর্ঘ পথে চলতে চলতে একসময় এমন এক প্রান্তে এসে দাঁড়াতে হয়, যেখানে ভোরের শিশিরভেজা দিন আর দুপুরের রৌদ্রোজ্জ্বল ব্যস্ততা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, সন্ধ্যার ম্লান আলোয়। একদিন যে মানুষ ছিলেন মায়ের কোলের নিষ্পাপ শিশু, ছুটে চলা কিশোর, আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরা আজ তিনি বয়সের ভারে নত, ধীর পদক্ষেপে চলা প্রবীণ। এটিই প্রকৃতির অমোঘ বিধান। তাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে মানুষ প্রায়ই নিজের প্রাপ্য সম্মান, স্নেহ, আর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হন। কর্মময় জীবন শেষ করে, আপনজনের জন্য জীবন উৎসর্গ করে, দেশের জন্য পরিশ্রম করে যাওয়া এই মানুষগুলোকে অনেক সময় পরিবার ও সমাজ কর্মহীন বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করে। বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর, সবখানে এ দৃশ্য ক্রমশ পরিচিত হয়ে উঠছে। কেউ অসুস্থ, কেউ একা, কেউবা অক্ষমতার কারণে নিজের প্রয়োজন নিজে মেটাতে পারছেন না। অথচ ধনী, মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র সব শ্রেণির প্রবীণেরই আছে একই চাহিদা জীবনের শেষ সময়টুকু যেন কাটে মর্যাদার সঙ্গে, প্রিয়জনের সান্নিধ্যে, শান্তি ও স্বস্তির পরশে। পরিসংখ্যানের ঠা-া অঙ্কও কখনো কখনো জীবনের গভীর সত্যকে উন্মোচিত করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ এর ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা’ প্রতিবেদন স্পষ্ট করে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ, এর মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। অথচ ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। মাত্র এক দশকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর হার বেড়েছে ২ শতাংশেরও বেশি।
এই বৃদ্ধির পেছনে আছে, গড় আয়ুর বিস্ময়কর অগ্রগতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৪ বছর ৩ মাস। জনসংখ্যাবিদরা বলেন, মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ বা তার বেশি মানুষের বয়স যদি ৬৫ বছরের ওপরে হয়, তবে সেটি প্রবীণপ্রবণ সমাজ। আর যদি বয়স্ক মানুষের হার ১০-১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তবে সেটি প্রবীণপ্রধান সমাজ। ইউনিসেফের পূর্বাভাস আরও স্পষ্ট করে দেয় গন্তব্যের পথচিত্র। বাংলাদেশ ২০২৯ সালে প্রবীণপ্রবণ সমাজে প্রবেশ করবে, আর সেখান থেকে মাত্র ১৮ বছরের মধ্যে ২০৪৭ সালে প্রবীণপ্রধান সমাজে রূপ নেবে। গড় আয়ুর এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্যের গল্প নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং জীবনমান উন্নয়নের এক যৌথ অর্জন। কিন্তু দীর্ঘায়ু মানেই শুধু দীর্ঘ সুখ নয়, এর সঙ্গে আসে নতুন বাস্তবতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেকোনো দেশের উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর। প্রবীণের সংখ্যা যখন ক্রমশ বাড়বে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার কমতে শুরু করবে, তখন টেকসই উন্নয়ন ধরে রাখতে হলে আমাদের প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা। যেমন: স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো ও সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো নীতি। কারণ, আজকের কর্মক্ষম মানুষই আগামী দিনের প্রবীণ, আর আগামী দিনের প্রবীণদের জীবনমান নির্ধারণ করা হবে তখন, যখন আমরা আজ কতটা প্রস্তুত হতে পারলাম, তার ওপর।
সমাজে একসময় যৌথ পরিবার প্রবীণদের নিরাপদ আশ্রয় দিত। বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু, ছিলেন সিদ্ধান্তের প্রধান স্তম্ভ। আজ শহুরে জীবনযাত্রা, পরিবারব্যবস্থা, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আর পশ্চিমা প্রভাব আমাদের পারিবারিক কাঠামো পাল্টে দিয়েছে। মানবিকতা ও নৈতিকতার অবক্ষয়ে প্রবীণদের একটি বড় অংশ আজ অবহেলিত, একাকী ও অসহায়। বার্ধক্যের ভারে নত এই মানুষগুলোর সমস্যা বহুমুখী। শারীরিক অসুস্থতা ও চলাফেরার সীমাবদ্ধতা তাদের অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। অনেকেই চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না, ওষুধ পান না, কিংবা কষ্ট সহ্য করে জীবন কাটান। শুধু শারীরিক কষ্ট নয় মানসিক অবহেলা, অপমান কিংবা কটূক্তিও তাদের অন্তরে গভীর ক্ষত তৈরি করে। তাদের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা নিঃসঙ্গতা। সারা জীবন যাদের চারপাশে ছিল কোলাহল, এখন সেই জায়গা দখল করেছে নীরবতা। তারা কথা বলতে চান, গল্প শোনাতে চান, কিন্তু শোনার মতো মনোযোগী শ্রোতা মেলে না। প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অবহেলার শীতলতা আর সময়ের নিরন্তর স্রোত মিলেমিশে তাদের মনকে ভারাক্রান্ত করে। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, এই মানুষগুলোই আমাদের ইতিহাসের ধারক। তাদের শ্রম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞা দিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের সমাজ। তারা কেবল অতীতের অংশ নন; তারা আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তিও। তাই প্রবীণজীবন শান্তিপূর্ণ ও স্বস্তিময় করতে হলে আমাদের তরুণ সমাজের মানবিক দায়িত্ব নিতে হবে। প্রবীণদের প্রতি নবীনদের প্রথম দায়িত্ব হলো, তাদের প্রতি গভীর সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন। প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলার সময় সর্বদা ভদ্র, কোমল ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করতে হবে। ধমকের সুর এড়িয়ে সৌজন্যমূলক ভাষা ব্যবহার করলে তারা শুধু স্বস্তি পান না, বরং অনুভব করেন যে তাদের জীবন-অভিজ্ঞতা ও অবস্থান এখনো মূল্যবান। তাদের পাশে সময় দেওয়া ও মনোযোগ দেওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, গল্প-আড্ডায় সময় কাটানো বা বিশেষ দিন ও উৎসবে তাদের স্মরণ করা তাদের একাকিত্ব কমিয়ে আনে এবং পরিবারের প্রতি তাদের টান আরও গভীর করে। অনেক সময় একটি আন্তরিক আলাপই তাদের দিনের সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে ওঠে। শারীরিক সেবাযতœও অপরিহার্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক সময়ে ওষুধ খাওয়ার তদারকি কিংবা ব্যক্তিগত সেবা যেমন চুল আঁচড়ানো, নখ কাটা বা গোসল করানোর মতো সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এসব কাজে আন্তরিক সহায়তা তাদের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে তোলে।
মানসিক সাপোর্ট প্রবীণ জীবনের আরেকটি অপরিহার্য উপাদান। তাদের জীবনের গল্প মন দিয়ে শোনা, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের একাকিত্ব দূর করতে আন্তরিকভাবে পাশে থাকা প্রবীণদের মনে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। এতে তারা বুঝতে পারেন যে, বয়স বাড়লেও পরিবারের সিদ্ধান্ত ও আলোচনায় তাদের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক অংশগ্রহণে সহায়তা করাও নবীনদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পারিবারিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রবীণদের আমন্ত্রণ জানানো এবং সম্মানজনক আসনের ব্যবস্থা করা শুধু ভদ্রতার পরিচায়ক নয়, বরং এটি তাদের সামাজিক মর্যাদা অটুট রাখার একটি উপায়। যাতায়াত ও চলাফেরায় সহায়তা করাও অত্যন্ত জরুরি। বাস, ট্রেন, লঞ্চে আসন ছেড়ে দেওয়া, রাস্তা পারাপারে সাহায্য করা কিংবা জনসমাগমস্থলে প্রাধান্য দেওয়া প্রবীণদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অপরিহার্য। ছোট্ট এই সহানুভূতিশীল আচরণগুলো তাদের মনে অসীম কৃতজ্ঞতা তৈরি করে। আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রবীণদের আর্থিক অধিকার, সম্পদ ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা রক্ষা করা, এবং প্রয়োজনে সন্তানদের পক্ষ থেকে মাসের শুরুতেই কিছু টাকা হাতে দেওয়া যাতে তারা নিজের কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারেন। এসব উদ্যোগ তাদের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতা বজায় রাখে। বিশেষ করে, আমাদের সমাজে প্রবীণ পিতারা সন্তানদের কাছে টাকা চাইতে সংকোচ বোধ করেন, তাই সন্তানের এই স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা তাদের জন্য মানসিক স্বস্তির বড় উৎস। যোগাযোগ বজায় রাখা, বিশেষ করে যারা দূরে থাকেন, ফোন বা বার্তার মাধ্যমে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া প্রবীণদের মনে করিয়ে দেয় যে তারা অবহেলিত নন। এই সামান্য যত্নই তাদের মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিতে পারে।
শিশুদের মধ্যে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া নবীন প্রজন্মের নৈতিক দায়িত্ব। পরিবারের ছোটদের শেখাতে হবে, প্রবীণরা শুধু বয়সে বড় নন তারাই এই সমাজ ও পরিবারের ভিত গড়ে দিয়েছেন। তাদের গড়ে দেওয়া সমাজব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছি আমি, আপনি, আমরা। সবশেষে, প্রবীণদের প্রতি ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের নিরাপদ আশ্রয়, পরিবারের ঐতিহ্য ও সামাজিক কাঠামো সবই তাদের শ্রম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ফসল। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি মানবিকতারও এক গভীর প্রকাশ। আমরা যেন ভুলে না যাই একদিন আমাদেরও বয়স বাড়বে, আমরাও হব প্রবীণ। তখন আমরা যেমন সম্মান, স্নেহ ও নিরাপত্তা চাইব, তেমনি আজ তা দিতে হবে যাদের বয়সের পথ আমরা অতিক্রম করছি। একজন প্রবীণ কেবল একজন মানুষ নন তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস, চলমান গ্রন্থ। তার মুখে বয়সের ভাঁজ পড়লেও, চোখে দৃষ্টি ম্লান হলেও, অন্তরের গভীরে তিনি বহন করেন অসংখ্য গল্প, অমূল্য অভিজ্ঞতা ও অনন্ত প্রজ্ঞা। সেই ভা-ার থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু যদি আমরা মন দিয়ে শুনতে চাই। তাই দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয় সমাজ ও রাষ্ট্রেরও। প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক স্বীকৃতি অপরিহার্য। তবে এগুলোর আগে দরকার এক মানবিক মনোভাব, যা প্রতিটি তরুণের ভেতরে জন্ম নেবে পরিবার থেকেই। যতদিন তরুণ সমাজ প্রবীণদের সম্মান করবে, ততদিন সমাজে নৈতিকতা ও মানবিকতা অটুট থাকবে। আসুন, আমরা আমাদের প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করি প্রশ্নাতীতভাবে। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সেবা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে। যেন জীবনের শেষ প্রান্তে তারা অনুভব করতে পারেন, ‘হ্যাঁ, আমার জীবন সার্থক হয়েছে। আমার সন্তানরা, আমার সমাজ আমাকে ভুলে যায়নি।’
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ ও চেয়ারম্যান ডিআরপি ফাউন্ডেশন
