আজ থেকে ১১৪ বছর আগে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জন্মাষ্টমী উৎসবের ছবি তুলেছিলেন বিখ্যাত জার্মান আলোকচিত্রী ফ্রিৎস ক্যাপ। ১৯১১ সালের ২০ ও ২১ জুলাই ঢাকার নবাবপুর ও ইসলামপুর থেকে ছবিগুলো তুলেছিলেন মি. ক্যাপ। ক্যাপের তোলা ছবিগুলোর মধ্য থেকে চারটি দুর্লভ আলোকচিত্র ছাপা হয় ওই বছর অক্টোবর মাসে রমানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রবাসী পত্রিকার কার্তিক ১৩১৮ সংখ্যায় [১১শ ভাগ, দ্বিতীয় খন্ড]। এ সংখ্যার ৯০ নম্বর পৃষ্ঠায় ত্রিপুরার মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের প্রধান সেনাপতি ও বিশিষ্ট আলোকচিত্রী মহিমচন্দ্র ঠাকুর ঢাকার জন্মাষ্টমী নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তার প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘ঢাকায় জন্মাষ্টমীর মিছিল’। এ প্রবন্ধের সঙ্গেই ছাপা হয় ক্যাপের তোলা চারটি ছবি। এর মধ্যে দুটি হরাইজেন্টাল ও দুটি ছবি ভার্টিক্যাল ফ্রেমে তোলা। মহিমচন্দ্রের প্রবন্ধের টিকায় উল্লেখ করা হয়, ‘ফটোগ্রাফগুলি ঢাকার প্রসিদ্ধ ফটোগ্রাফার মি. এফ. ক্যাপ কর্ত্তৃক উঠান তাঁহার অনুমত্যনুসারে এইসব ছবি প্রকাশিত হইল। এজন্য লেখক তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞ।’
মহিমচন্দ্রের লেখা থেকে জানা যায়, শিশুকাল থেকে তিনি ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিলের কথা শুনে আসছিলেন। কিন্তু কখনো তার দেখার সুযোগ হয়নি। ওই বছর মিছিলের বাহার দেখার জন্য কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানের গণ্যমান্য লোকের সমাগম হয়েছিল। ভারতসম্রাটের দৃষ্টি ও তুষ্টির জন্য এ মিছিল কলকাতাতেও প্রদর্শিত হবে এ কথা জানাজানি হওয়ার পর তা দেখার জন্য বহুতর লোকের সমাগম হয়। এ মিছিলে মহিমচন্দ্র অভিনব যা কিছু দেখলেন ক্ষুদ্র প্রবন্ধে বর্ণনা করা অসাধ্য। তাই পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য তিনি ফ্রিৎস ক্যাপের কাছ থেকে কয়েকখানা ফটোগ্রাফ চেয়ে নেন। মহিমচন্দ্র তার প্রবন্ধের সঙ্গে ক্যাপের ছবিগুলো প্রবাসীতে পাঠান।
মহিমচন্দ্র তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘এ মিছিলে অনেক টাকা খরচ হয় এবং মিছিলে লাখ লাখ টাকার সরঞ্জাম থাকে। এ রকম বিরাট মিছিল একমাত্র ঢাকাতেই সম্ভব। সোনা ও রূপোর ১০-১২টি চৌকি [প্রায়ই দেবতার আসন] বাহির হয়। এইসব বহুমূল্যের জিনিসে ঢাকার কারুকার্য্য ও শিল্প নিপুণতার আদর্শ প্রদর্শিত হয়। এছাড়া হাতি, ঘোড়া, ক্ষুদ্র-বৃহৎ নানা জিনিস বহুল পরিমাণে বাহির হয়। এসব যে ধনবান ব্যক্তিদের সঞ্চিত ও আদরে সামগ্রী এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। মিছিলে যে সব সং [পৌরাণিক ও সামাজিক অভিনয়] ছিল তাও অতি সুন্দর ছিল। নবাবপুর ও ইসলামপুর থেকে দুই দিন দুই দফা মিছিল বের হয়। ৫ শ্রাবণ নবাবপুর থেকে প্রথম মিছিল বের হয়। পরদিন বের হয় ইসলামপুর থেকে।’
মহিমচন্দ্র আরও উল্লেখ করেন, ‘অল দ্যাটস গ্লিটার্স ইজ নট গোল্ড ইহা প্রাশ্চাত্য বাক্য, কিন্তু এ মিছিলে প্রায়ই ছিল অল দ্যাটস গ্লিটার ইজ গোল্ড। ঢাকার নাকাসি জগৎ [সোনারূপা বা অন্যান্য ধাতু নির্মিত পাত্রের উপর খোদাই করা নকশা] প্রসিদ্ধ এবং শিল্প জগতে অতি আদরের জিনিষ। সোনা ও রূপার চৌকিতে এই নাকাসিকার্য্য অতি আশ্চর্য্য রকমের ছিল। দুঃখের বিষয় দূরতা প্রযুক্ত ফটোগ্রাফে তাহার প্রতিকৃতি উত্তম উঠাইবার সুবিধা হয় নাই। যদি খন্ড খন্ড- ভাবে ছবি উঠান হইত তাহা হইলে কতক সুবিধা হইত, কিন্তু জনতার দরুন তাহার সুবিধা পাওয়া যায় নাই।’
বিশ শতকের শূন্য দশকে ঢাকার যত দুর্লভ ছবি দেখি তার বেশিরভাগই ফ্রিৎস ক্যাপের তোলা। বিশ শতকের একেবারে শেষের দিকে ঢাকায় আসেন আলোকচিত্রী ফ্রিৎস ক্যাপ। তিনি ছিলেন ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার সদস্য। এই সোসাইটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ঢাকার নবাব খাজা আহসান উল্লাহ। নবাব আহসান উল্লাহ অনুরোধেই কলকাতা ঢাকায় আসেন ফ্রিৎস ক্যাপ। ঢাকায় এসে ১৯০০ সাল বা তার আগের বছর আহসান উল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় আহসান মনজিলের পাশে স্টুডিও খোলেন ক্যাপ। তার স্টুডিওটিই ঢাকার প্রথম বাণিজ্যিক স্টুডিও বলে জানা যায়। ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ছিলেন ক্যাপ। প্রথম বিশ^যুদ্ধের টানাপড়েনে পড়ে তার অন্য দুটি স্টুডিও গোছাতে ভারতে যান ক্যাপ। যুদ্ধের কারণে ওখানে গিয়ে আটকে পড়েন তিনি। এর মধ্যে তার জামাকাপড় সেলাই করতেন যে দর্জি, তার কাছে সামান্য কিছু টাকা বাকি ছিল। সেই টাকার জন্য তিনি মামলা করে বসেন। সেই মামলায় ক্যাপের স্টুডিও ও যাবতীয় সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। যুদ্ধ শেষে আদালতের রায়ে বলা হলো জার্মান নাগরিক হলেও তিনি ব্রিটিশদের শত্রু নন। জামিন পেয়ে কলকাতা থেকে তিনি আর ঢাকায় আসেননি।
