উল্লাস উৎসবে খুলল উত্তরের দীর্ঘতম সেতু

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৩৩ এএম

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের বাসিন্দাদের জন্য উন্মুক্ত করা হলো তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত ১ হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় তিস্তা সেতু (মাওলানা ভাসানী সেতু)। এই সেতুর মাধ্যমে দুই জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো। দুই দশকের প্রত্যাশা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই সেতু। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং এ অঞ্চলের মানুষের জন্য উন্নয়ন ও নতুন সম্ভাবনার প্রবেশদ্বার। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের দূরত্ব কমেছে প্রায় ১০০ কিলোমিটার।

তবে কুড়িগ্রামের চিলমারী অংশে ৫.২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে সংযোগ সড়কের কাজ এখনো সম্পূর্ণ না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। উদ্বোধনের পর তিনি সেতুর উভয় প্রান্ত পরিদর্শন করেন। এ সময় সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি)-এর প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, এলজিইডির কর্মকর্তা, সেতু নির্মাণসংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ এবং উপদেষ্টার সফরসঙ্গীরা উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনের পরপরই সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা মুফতি মো. ওমর ফারুক মোনাজাত পরিচালনা করেন। এরপর সেতুর সুন্দরগঞ্জের হরিপুর প্রবেশমুখে ফিতা কেটে সেতুটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ সেতুর দুই প্রান্তে সমবেত হন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ নতুন সেতুটি দেখতে আসেন। তবে তীব্র যানজটের কারণে দর্শনার্থীরা দুর্ভোগের শিকার হন। উৎসুক জনতার ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেশ বেগ পেতে হয়।

এদিকে উদ্বোধনের আগে থেকেই সেতু এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ভোর থেকে তিস্তা নদীর তীরে দুই জেলার হাজার হাজার দর্শনার্থী এবং সুন্দরগঞ্জ ও চিলমারী উপজেলার সাধারণ মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন। কেউ পরিবারের সঙ্গে, কেউ দলবেঁধে এসেছিলেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ায় তাদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে উচ্ছ্বাস ও গর্বের আলো। কিন্তু কুড়িগ্রামের চিলমারী অংশে এলজিইডির নির্মাণাধীন ৫.২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে সংযোগ সড়কের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সেতুটি উদ্বোধন করা হয়েছে। এ কারণে চিলমারীর ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হলেও সংযোগ সড়কের কাজ শেষ না হওয়ায় তারা সেতুর পূর্ণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। এজন্য তারা কুড়িগ্রামের এলজিইডি এবং স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলাকে দায়ী করছেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, এই সেতুর উদ্বোধন উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাংলাদেশের অন্যতম ফাউন্ডিং ফাদার মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সম্মান জানাতে তার নামে সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করার চেষ্টা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি হাসিনা সরকারের সময় ভারতীয় আগ্রাসনের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে আমরা লড়াই করব। ভারতের সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে কাজ চলছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রকল্প পরিচালক আব্দুল মালেকের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম-সচিব শাহিনুর রহমান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ মিয়া, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ও কেন্দ্রীয় ইউনিট সদস্য ডা. আব্দুর রহীম সরকার, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদ, জুলাই যোদ্ধা রাশেদুজ্জামান আশিক প্রমুখ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার, সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওফিড)-এর অর্থায়নে ৯২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০১২ সালে তিস্তা নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু হিসেবে নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সেতুটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে দরপত্র আহ্বান করা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করতে পারেনি। তবে নানা জটিলতা কাটিয়ে ২০২১ সালে পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ শুরু হয়। সৌদি সরকারের অর্থায়নে ১ হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু, ৯৬ মিটার আর্চ সেতু, অ্যাপ্রোচ সড়ক, ৭ কিলোমিটার নদীশাসন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১৫৪ একর জমি অধিগ্রহণ ও ৮২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৭৫ কোটি টাকা।

এলজিইডির তত্ত্বাবধানে চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন সেতুটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে। সেতু নির্মাণে ২৯০টি পাইল, ৩০টি পিলার, ২৮টি স্প্যান এবং ১৫৫টি গার্ডার বসানো হয়েছে। উভয় প্রান্তে পানি নিষ্কাশনের জন্য ১২টি ব্রিজ ও ৫৮টি বক্স কালভার্ট নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া সেতুর উভয় পাশে স্থায়ী তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করেছে এলজিইডি। এই সেতুর সড়ক সংযোগের মাধ্যমে কুড়িগ্রামের সঙ্গে গাইবান্ধার বেলকা বাজার, পাঁচপীর, ধর্মপুর, হাট লক্ষ্মীপুর, সাদুল্যাপুর ও ধাপেরহাটসহ অন্তত ১০টি বাজার ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। ফলে সুন্দরগঞ্জ ও চিলমারী অঞ্চলসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত