তিতলি এখনো অনেক ছোট। জুন মাসে ওর বয়স চার বছর পূর্ণ হয়েছে। এখানো স্কুলে ভর্তি হয়নি। স্কুলে না গেলেও সে আমার বইয়ের ভেতরে আঁকা রঙিন ছবিগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখে। তিতলি বুঝি ছবিগুলোর সঙ্গে কথা বলছে।
একটা বইয়ের মধ্যে লম্বা এক ঘাসফুল আঁকা। পাশেই আরেকটা ছোট ফুল। তিতলি ফুল দুটো দেখে বলে এটা মা ফুল, ওটা ছা ফুল। ওর কথা শুনে হাসি পায়। ওই ফুল দুটোর পাশেই দুটো হলুদ রঙের পাখি। ঠোঁঠ হা করে আছে পাখি দুটো।
তাই দেখে তিতলি বলে, ওরা এখনো উড়তে শেখেনি। তাই বাচ্চা পাখি দুটো কান্না করছে। তিতলি বইয়ের প্রতিটি ছবি দেখে আর একটা করে গল্প বানায়। ওর কথা শুনে হাসি পায়।
এই তো কয়দিন আগে আমি ক্লাসের পড়া পড়ছি। তিতলি পাশে বসে। মা কিচেনে। আমি পড়ছি, ‘ভাদ্র মাসে তাল পাকে।’ ওদিকে মা বলে উঠল, যা গরম। একদম তাল পাকা গরম।’
মায়ের কথা শুনে তিতলি বলল, ‘মা তুমিও আপুর পড়া পড়ে দিচ্ছ। আমার পড়াও পড়ে দিতে হবে কিন্তু।’
ওর কথা শুনে মা তখন হাসল না। অন্যদিন হলে মা হাসতে হাসতে গড়িয়ে যেত। কাজ রেখে তিতলিটার কাছে এসে আদর দিত।
কিন্তু আজ সেটা করল না।
শুধু আমাকে বলল, কাকলি ভালো কথা। তোমার সঙ্গে পড়ে হরিরামপুরের ওই মেয়েটার নাম কী?
বললাম, দোলনের কথা বলছ?
‘হ্যাঁ। দোলনের কাছে জেনে এসো ওদের বাড়ির পশ্চিমের নদীর চরে কাশফুল ফুটছে নাকি। এখন তো শরৎকাল।’
মায়ের কথা শেষ হওয়ার পর থেকেই তিতলি বায়না ধরল। সেও আমার সঙ্গে স্কুলে যাবে। ওকে কোনোমতে বুঝ দিয়ে স্কুলে গেলাম।
ক্লাস শেষে বাসায় এসে ফুল ফোটার কথা জানালাম।
মা বলল, ‘এখন ঘুমাও। বিকেলে আমরা যাব।’ বিকেলে আমরা নদীর পাড়ে গেলাম। এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে নদীটা। দুই ধারে ছোট ছোট গ্রাম। মাঝিরা ছোট ছোট ডিঙি নৌকা বয়ে যাচ্ছে। আমরা একটা বড় শ্যালো মেশিনের নৌকায় উঠলাম। তবে মেশিনের ঘটর ঘটর শব্দ ভালো লাগল না। আমাদের নৌকার শব্দে পাখিরা দূরে চলে গেল। খুব ইচ্ছে ছিল পালতোলা নৌকায় চড়ার।
মা বলল, আজ নাকি পাল খাটানো বাতাস নেই।
কী আর করার। নৌকা থেকে নামলাম। ঠান্ডা বাতাসে মনটা জুড়িয়ে গেল। আমরা দুই বোন কাশফুলের কাছে গেলাম। মা আগে বাধা দিল। কাশফুল যেন না ছিঁড়ি।
মায়ের কথা, আমাদের মতো সবাই যদি এখানে কাশফুল নিয়ে বাসায় ফিরে যায়, তাহলে সব কাশফুল ফুরিয়ে যাবে। সামনের বছর আর কাশফুল থাকবে না। তখন আর আসাও হবে না।
মায়ের এ কথাগুলো আমার ভালো লাগল। এর পরও আমি ছোট একটা ঘাসফুল তুলে আমার ছোটবোন তিতিলির কানে গুঁজে দিলাম। আর বললাম, তুমি এখন ঘাসফড়িং হয়ে উড়ে চলো।
তিতলি আমার কথা শুনে অনেক মজা পেল। সন্ধ্যা নামার আগেই আমার বাসায় ফিরে এলাম।
