বিগত আওয়মী ফ্যাসিবাদী সরকারের দীর্ঘ সময় ধরে চলা দুঃশাসন ও লুটপাট ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পেছনে অন্যতম কারণ হলো অর্থনৈতিকভাবে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া। বিগত সরকার সবচেয়ে বেশি লাইনচ্যুত হয়েছে, শেষের দুই-তিন বছরে। তখন অসংখ্য মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে এবং এর আড়ালে, অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পচার করেছে। পাচারকৃত অর্থ দিয়ে দেশে প্রায় চারটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা যেত। তারা যে শুধু দেশের অর্থ পাচার করেছে তাই নয়, দেশের ব্যাংকব্যবস্থাকেও ধ্বংস করেছে। ফলে বৈদেশিক রিজার্ভ তলানিতে ঠেকেছিল। অথচ কয়েক বছর আগেও, রিজার্ভ নিয়ে বিগত সরকারের দাম্ভিকতার শেষ ছিল না। তখন মূল্যস্ফীতি ছিল লাগামহীন। ফলে বিগত সরকারের পতন সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র। দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার অন্যতম কারণ ছিল, দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করা। প্রশ্ন হলো দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হলো কীভাবে?
বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে দেশের অর্থ বিদেশে পাঠাতে গেলে, চারটি কারণ ছাড়া অর্থ দেশের বাইরে পাঠানো যায় না। সেগুলো হলো শিক্ষা, চিকিৎসা, ট্রাভেল কোটা এবং বিশেষ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ (খুবই সীমিত)। এর বাইরে কেউ বিদেশে টাকা পাঠাতে পারবে না। বৈধ উপায়ে টাকা পাঠাতে গেলেও, কাগজপত্রের ঝামেলায় ঘাম ঝরবে অনেকের। তাহলে এত টাকা পাচার হলো কীভাবে? আমরা এসব বিষয় নিয়ে সোচ্চার হই না, যে বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন, সে বিষয়গুলো জানি না এবং জানার আগ্রহ তৈরি হয় না। আমরা কখনোই এর ব্যাখ্যা রাষ্ট্রের কাছে চাই না। আমরা আলোড়ন তৈরি করি, কেন সাদা পাথর কালো হলো? কেন আমি ভোট দিতে পারি না? অমুক বাম দল, তমুক ডান দল এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আর এই ব্যস্ততার আড়ালে অর্থ পাচারকারীদের জন্য অবলীলায় চলে অর্থ পাচারের মহোৎসব। এসব মিডিয়া ট্রায়ালের পেছনে অর্থ পাচারের পুকুর চুরির মহোৎসব চলে। গ্রামে একটি প্রবাদ আছে, পেছন দিয়ে বোয়াল মাছ গেলেও আমরা খেয়াল করি না, কিন্তু সামনে দিয়ে একটি দারকিনা মাছ গেলেও সেটি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি।
আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা, গত বছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। আমরা বাহ্বা দিচ্ছি। আবার অনেকে হাততালিও দিচ্ছেন। কিন্তু একবারও কি কেউ হিসাব মিলিয়ে দেখেছেন, কত আসা উচিত ছিল এবং কত এসেছে? ২০২৩ সালে ১২ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা এক কোটি পঞ্চান্ন লাখ। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা ১ কোটি ২৫ লাখ। এই হিসাবটিও যথেষ্ট নয়, যথেষ্ট গোলমেলে। তারপরও প্রবাসীর সংখ্যা যদি অর্ধেক ধরি, অর্থাৎ ৬০ লাখ এবং প্রত্যেক প্রবাসী তার পারিবারিক ব্যয় মেটানোর জন্য প্রতি মাসে ৫০০ ডলার করে পাঠালেও, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় প্রতি মাসে দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এর চেয়েও অনেক কম, অর্থাৎ ২০০ কোটি ডলার প্রবেশ করলেও সেটা নিয়ে আমরা খুশি। প্রশ্ন হলো,বাকি অর্থ কী হয়? এই অর্থগুলো কি দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করে না, নাকি দেশীয় কালো টাকা এবং সাদা টাকা সব হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যায়? এভাবেই কি অর্থ পাচার হয়? বর্তমানে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের চেইন ভেঙে পড়েছে। অথবা যারা দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করবে, তারা এই মুহূর্তে মাঠে বা দেশে নেই। তাই বাধ্য হয়ে রেমিট্যান্স বৈধ পথে আসছে। যা রাষ্ট্রের কৃতিত্বের তেমন কিছু নেই। তবে রাষ্ট্রকে বিভিন্ন জায়গায় আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন এবং প্রত্যেক নাগরিকেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন অধিকার সম্পর্কে। আমরা যদি একটি টাকাও বিদেশে পাচার হতে না দিই, তাহলে দেশের রাঘব-বোয়ালরা কখনোই দেশের বাইরে নোঙর ফেলতে পারবে না। বাধ্য হবে দেশেই টাকা বিনিয়োগ করতে। দেশের অর্থ পাচার না হয়ে বিনিয়োগ হলে, কর্মসংস্থান ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাবে। তখনই রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।
এবার বলি, কেন পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনা কঠিন। কারণ টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়েছে, তার দালিলিক কোনো প্রমাণ আমার কাছে নেই। ফলে প্রমাণ করা দুরূহ। কিন্তু টাকা যদি বৈধপথে পাচার হতো, খুব সহজেই পাচারকৃত টাকা দেশে ফেরত নিয়ে আসা সহজ হতো। কিন্তু এই সহজ কাজটি জেনেবুঝেই বন্ধ করেছে দেশের কিছু রাজনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকরা। বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে, যতটা সম্ভব দ্রুততম সময়ে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে টাকা পাঠানোর যাবতীয় উপায় সহজ করা এবং যারা বিদেশে কর্মরত, তারা সবাই দেশে অর্থ পাঠায় কি না সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাষ্ট্রের গ্রহণ করা উচিত। শুধু তাই নয়, টাকা পাঠানো এবং উত্তোলনের জন্য কাগজপত্রের ঝামেলা আরও সহজ করা প্রয়োজন। দেশের মানুষ একটু কম শিক্ষিত হওয়ায় তারা কাগজপত্রের ঝামেলা সহজে নিতে চায় না। আবার কাগজপত্রের ঝামেলা বা ত্রুটির কারণে অনেক ব্যাংকার দুদকের বারান্দায় জুতা ক্ষয় করছে। অনেকে হয়তো বলবেন, এভাবে সবকিছু সহজ করলে আরও বেশি পরিমাণে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হবে। হয়তো একটু বেশি পাচার হবে, এটা সত্য। কিন্তু তা বৈধপথে পাচার হবে। কিন্তু বৈধপথে পাচার হওয়ার ফলে, খুব সহজেই রাষ্ট্রের কাছে তার হিসাব থাকবে। কে করছে, কত করছে, কেন করছে এবং কোন দেশে পাচার করছে? রাষ্ট্র চাইলেই তা আবার ফেরত নিয়ে আসতে পারবে সহজেই। সুতরাং এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন এ সব বিষয়ে।
লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট
