মুদ্রাপ্রবাহে শক্তি প্রবাসীরা

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৫, ০৩:০১ এএম

বিগত কয়েক বছরে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ পাচারের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আমদানি ও রপ্তানির অঙ্ক বাড়িয়ে করা হয়েছে অর্থ পাচার। ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে একপ্রকার শূন্য করে ফেলা হয়েছিল। যার নেতিবাচক প্রভাব এখনো দেশের ব্যাংক খাতকে ভোগাচ্ছে। আর রিজার্ভ দুর্বল হয়ে পড়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের  আমলেই ব্যাপকভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থান যখন সংঘটিত হয়, তখন দেশের অর্থনীতি এক গভীর খাদের কিনারে অবস্থান করছিল। বলা চলে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম। সেই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

বাংলাদেশের প্রবাসীরা যে হারে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে আশার আলো জ্বালাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশে এসেছে ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ রেমিট্যান্স এসেছিল ২৩.৯১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৬.৮০ শতাংশ। এর আগে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে, সেবার প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ২৪.৭৭ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে আসে ২১.৬১ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২-এ আসে ২১.০৩ বিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, অবিরতভাবে প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এ ছাড়া নতুন অর্থবছরের শুরুটাও হয়েছে আশাব্যঞ্জক। কেবল জুলাই মাসেই দেশে এসেছে ২ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। চলতি মাস আগস্টের প্রথম ২৩ দিনে এসেছে ১৭৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স। এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ দেশের মজুদ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রাবাজারেও স্বস্তি নিয়ে আসছে। ব্যাংক খাতের কর্মকর্তাদের মতে, প্রবাসী আয়ের এই প্রবৃদ্ধির ফলে ডলারের ওপর চাপ কমেছে।

বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ এক অনিবার্য শক্তি। বাংলাদেশে সেই প্রবাহের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। দেশের কোটি কোটি প্রবাসী তাদের ঘামঝরা শ্রমের অর্থ পাঠিয়ে নিজেদের পরিবারের জীবনযাত্রা যেমন পাল্টাচ্ছেন; তেমনি পুরো দেশের অর্থনীতিকেও তারা এগিয়ে নিচ্ছেন। তাদের পাঠানো অর্থ বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান এবং ব্যবসার প্রসারে আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। বলা যায়, প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির অদৃশ্য নায়ক।

রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত শক্ত করছে। অধিকাংশ প্রবাসী আয় সরাসরি গ্রামে পরিবারের কাছে পৌঁছায়। যার ফলে বাড়ছে ক্রয়ক্ষমতা, উন্নত হচ্ছে জীবনযাত্রার মান, গড়ে উঠছে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য। অনেক পরিবার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গৃহনির্মাণে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এক অর্থে বলা যায়, প্রবাসী আয়ের প্রতিটি ডলার গ্রামীণ উন্নয়নকে গতিশীল করছে।

শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে ডলারের বিনিময় হার দীর্ঘদিন স্থিতিশীল রাখা গেছে। বাজারে ১২১ থেকে ১২২ টাকার মধ্যে ডলারের মূল্য ধরে রাখা হয়েছে। হুন্ডির সঙ্গে প্রতিযোগী হারে বৈধ চ্যানেলে প্রেরণে প্রণোদনা সংযুক্ত করায় প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলকেই বেশি লাভজনক মনে করছেন। সরকারের হুন্ডিবিরোধী অভিযান, মানি লন্ডারিং রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নজরদারিতে অবৈধ চ্যানেল সংকুচিত হয়েছে। এতে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে আইনি পথে অর্থ পাঠানোর মনোভাব গড়ে উঠেছে। বিশ্ববাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়াসহ নতুন নতুন শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে। সরকার দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা এবং চুক্তিনির্ভর প্রেরণ নিশ্চিত করায় প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ও মান দুই-ই বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থার কিছু সংস্কার যেমন প্রবাসী অ্যাকাউন্টে লেনদেনের সুবিধা বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্সভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এতে মানুষ বৈধ চ্যানেলের প্রতি উৎসাহী হয়েছে।

রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদেশে থাকা কর্মীরা যখন নিজের পরিবারকে টাকা পাঠান, তখন তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বাড়ায়। এই বাড়তি মুদ্রা সরকারের জন্য বিভিন্ন কাজে সহায়ক হয়। যেমন আমদানি খরচ মেটানো, ঋণ পরিশোধ করা, খাদ্য ও জ্বালানি আমদানিতে সাহায্য করা ও বাজারে ডলারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। এর ফলে ব্যাংকগুলো আরও বেশি এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে পারে, বিশেষ করে শিল্প ও ওষুধ খাতে, যা দেশীয় উৎপাদন ও সেবা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন নতুন একটা আস্থা তৈরি হচ্ছে, কারণ, রেমিট্যান্সের কারণে মুদ্রার জোগান সুষ্ঠু হচ্ছে। বাজারে ডলারের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার ফলে আমদানি পণ্যের দামও নিয়ন্ত্রণে আসছে। খাদ্যপণ্যের মূল্য কমে আসায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরে আসছে। এই মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই রেমিট্যান্স শুধু অর্থ পাঠানো নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক বড় চালিকাশক্তি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত