অবকাঠামো সংকটে ধুঁকছে দেড়শ বছরের পুরোনো কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল 

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৫, ০৩:৪৭ পিএম

দুটি ছোট কক্ষ, সামনের খোলা বারান্দা, মাথার ওপরে টিনের ছাউনি। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। এ যেন রোগীদের জন্য নয়, দুর্ভোগেরই আরেক নাম—কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল।

এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে মাত্র দুটি কক্ষে বসেন মেডিসিন বিভাগের নয়জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। একজন চিকিৎসক প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন রোগী দেখেন—কিন্তু চিকিৎসকের বসার জায়গা পর্যন্ত নেই, রোগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত চেয়ার বা পর্যবেক্ষণ বেড।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৮৪৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে “কুমিল্লা চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি” নামে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ১৮৭১ সালে এটি ‘কুমিল্লা দাতব্য চিকিৎসালয়’ হিসেবে রোগী ভর্তি কার্যক্রম শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৯৭১ সালে এটি ৫০ শয্যার সাধারণ হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়, যা বর্তমানে ‘কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল’ নামে পরিচিত।

বর্তমানে জেলার অন্যতম এই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। ২০২৩ সালে এখানে সেবা নিয়েছেন ৩ লাখ ৩৯ হাজার রোগী, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ লাখে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার রোগী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে হাসপাতালটিতে রয়েছে মাত্র ১৯টি কক্ষ। সেখানে কর্মরত আছেন সরকারি ৩৩ জন এবং অবৈতনিক ১৬ জনসহ মোট ৪৯ জন চিকিৎসক। একই রুমে ২-৩ জন চিকিৎসককে বসতে হয়। অধিকাংশ কক্ষেই নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, কিছু কক্ষ স্যাঁতস্যাঁতে, দেয়ালের রং উঠে গেছে।

রোগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বসার জায়গা, বিশ্রামের ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে অনেকেই গাছের নিচে, পুকুরপাড়ে কিংবা অটোরিকশায় বসে অপেক্ষা করেন। বর্ষা বা প্রচণ্ড গরমে অপেক্ষার সময় আরও দুর্ভোগে পড়েন শিশু, বৃদ্ধ ও গুরুতর রোগীরা।

এ বিষয়ে মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. আল মামুন বলেন, ‘এটা কোনো চিকিৎসার পরিবেশ না। রুমে ঢোকার পথেই ভিড়, রোগী দাঁড়িয়ে থাকে, পাশেই বসেন নার্সরা। রোগী দেখার মতো মনোযোগ বা সুযোগ কিছুই নেই।’

চিকিৎসকরা বলছেন, রোগীর চাপ বাড়লেও বাড়েনি চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি বা অবকাঠামো। বরং রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রকট হয়ে উঠছে সংকট।

এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট উপজেলা থেকে আসা মিলন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকাল ৭টা থেকে ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। সিমেন্টের বেঞ্চে তিন ঘণ্টা বসে থাকার পর সিরিয়াল পাই। বাবার হাত-পা অবশ, অথচ বসার ভালো জায়গা পর্যন্ত নেই।’

চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সামনে ভিড় সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে বাবাকে নিয়ে আসা দেলোয়ার বললেন, ‘চিকিৎসক ভালো, সেবাও ভালো। কিন্তু একটাই সমস্যা—জায়গা নেই। বাবা পুকুরপাড়ে বসে আছেন, আমি সিরিয়ালের জন্য দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি এলো, ভিজেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।’

চর্ম বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪০০ রোগী আসেন। অথচ চিকিৎসক মাত্র ৩ জন, তাও তারা সংযুক্তিতে। প্রয়োজন অন্তত ৬-৮ জন।

মেডিসিন বিভাগেও প্রতিদিন রোগী হয় গড়ে ৪০০-৫০০ জন। অথচ পদায়নকৃত চিকিৎসক মাত্র তিনজন। শিশু বিভাগে রোগী গড়ে ২৫০ জন, সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন মাত্র দু’জন।

এ বিষয়ে হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. মো. রাসেল খান বলেন, ‘সরকারি খরচে মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাচ্ছে। বিনামূল্যে অপারেশন হচ্ছে, ওষুধ দেওয়া হচ্ছে—এ কারণেই রোগী বাড়ছে। কিন্তু এই পরিমাণ রোগী সামলাতে আরও চিকিৎসক ও বড় অবকাঠামো দরকার।’

আবাসিক মেডিকেল অফিসার আব্দুল করিম খন্দকার বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, সেবার পরিধিও বাড়ছে। কিন্তু হাসপাতালের কাঠামো দুর্বল। চাইলেও বেশি চিকিৎসক দিতে পারছি না।’

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ইকবাল আনোয়ার বলেন, ‘আগের তুলনায় সরকারি চিকিৎসকের কাছে সেবা নিতে আসার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘একজন চিকিৎসককে তার কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রোগীকে যেন তিনি মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করতে পারেন সেজন্য তাকে সময়ও দিতে হবে।’

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ও কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক আলী নূর মোহাম্মদ বশির বলেন, ‘১৬৫ বছর বয়সী হাসপাতালটিতে ক্যাম্পাসে ৫ একর জায়গা রয়েছে। হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যা হাসপাতালে উন্নীতকরণের জন্য আবেদন করা হয়েছে মন্ত্রণালয়। যত দ্রুত এই প্রকল্প অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন হবে কুমিল্লার মানুষ তত ভালো সেবা পাবেন।’

একই রুমে একাধিক চিকিৎসক বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না মন্তব্য করে সিভিল সার্জন বলেন, ‘আমাদের আসলেই কিছু করার নেই। প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার রোগীর চাপ সামলাতে আমাদের একই রুমে দুইজন বা তিনজন চিকিৎসক বসতে হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত