চট্টগ্রামে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ বহির্ভূত তিনটি পৃথক খাত দেখিয়ে প্রায় ৫৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা অপচয় ও আত্মসাতের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, ভাগ্নে-ভাগ্নি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, টিউলিপ সিদ্দিক, আজমিন সিদ্দিকসহ তৎকালীন মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্যদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা করলেও ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের তহবিল তছরুপ, অপচয় এবং আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের এটিই প্রথম মামলা।
আজ বৃহস্পতিবার দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন (প্রতিরোধ) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্পের বাইরে অসৎ উদ্দেশ্যে ‘পরিষেবা এলাকা’, ‘পর্যবেক্ষণ সফটওয়্যার’ এবং ‘একটি টাগবোট’ এই তিনটি পৃথক খাত দেখিয়ে ৫৯ দশমিক ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশী টাকায় ৫৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা আত্নসাৎ, অপচয় ও রাষ্ট্রীয় তহবিলের ক্ষতিসাধন করায় তৎকালীন সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুদক এই অভিযোগ গঠন করেছে।
মামলার অপর তিন আসামি হলেন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক (পরবর্তীতে মন্ত্রী পরিষদ সচিব) খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমদ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সাবেক পরিচালক (অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব পরিচিতি-৩৬৪২) আলীম উদ্দিন আহমেদ।
দুর্নীতি দমন কমিশন ইতোমধ্যে মামলা রুজুর অনুমোদন দিয়েছে। দুদকের উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল হকের নেতৃত্বে সহকারী পরিচালক মো. আবদুল মালেক, উপ-সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং বৃহস্পতিবার এই মামলা রুজু করা হয়েছে।
কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০১০ সালে যে কল্পনাপ্রসূত উদ্দেশ্য বর্ণনা করে কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ করা হয়েছিল। তিনি এই টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়কে এখন ‘সরকারের কাছে গলার কাঁটা’ বলে মন্তব্য করেছেন। ‘কর্ণফুলী টানেল হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চাভিলাষ প্রকল্প। যাকে ‘চৌবাচ্চায় হাঙ্গর লালনের সঙ্গে তুলনা করা যায়’। বছরের পর বছর রাষ্ট্রের কোটি-কোটি টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করে যেতে হচ্ছে। টানেল ব্যবহার জনস্বার্থ রক্ষা ও আয়বর্ধক না হলে এই টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বছরের পর বছর টানতে হবে রাষ্ট্রকে। কারণ কর্ণফুলী টানেলের যে কোন ক্ষতির সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী মোহনার সরাসরি সম্পৃক্ত।
দুদকের তদন্তে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের পর প্রতিমাসে রক্ষণাবেক্ষণ ও আনুষাঙ্গিক ব্যয় মেটাতে ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৭১ হাজার ৭১ টাকা খরচ করতে হয়। সেই হিসাবে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে ২০২৫ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ২২ মাসে টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ, বেতন ভাতাসহ আনুষাঙ্গিক ব্যয় মেটাতে খরচ হয়েছে ২০৫ কোটি ৮৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫৬১ টাকা। পক্ষান্তরে উপরোক্ত ২২ মাসে টানেলের ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচলে আয় হয়েছে ৬৭ কোটি ২৫ লাখ ৫৪ হাজার ১০০ টাকা।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাব মতে টানেল উদ্বোধনের পর প্রতিমাসে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি ৩০ লাখ ৪৩০ টাকা। অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২২ মাসে টানেলের পেছনে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩৮ কোটি ৬০ লাখ ৯ হাজার ৪৬১ টাকা।
দুদক সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে কর্ণফুলি নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের জন্য মূল ডিপিপি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে রিভাইজড ডিপিপিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২২ সালে তা সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি করে প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাবনা অনুমোদন করা হয়।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনাসহ অনেক সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, নেতা হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের জালে আটকা পড়লেও সড়ক পরিবহণ ও সেতু বিভাগের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছর ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, মামলার অধিকতর তদন্ত চলছে। চার্জশিট দাখিল ও বিচার প্রক্রিয়া শুরুর সময় পর্যন্ত তদন্তে আসা অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে শেখ হাসিনাসহ একনেক কমিটির সদস্যরাও এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুদকের তদন্তে দেখা যায়, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্পে অনুমোদিত প্ল্যানের বাইরে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ‘পরিষেবা এলাকা’, ‘পর্যবেক্ষণ সফটওয়্যার’ এবং ‘একটি টাগবোট’ অন্তর্ভুক্ত করেন।
যা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় তিনটি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান তাদের রিপোর্টে সুপারিশ করেননি। এরপরও রাষ্ট্রিয় তহবিল তছরুপের মানসে সেতু মন্ত্রী ওবায়দৃল কাদের প্রকল্পে সুপারিশ বহির্ভুত তিনটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে ৫৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা আত্নসাৎ, অপচয় ও রাষ্ট্রিয় তহবিলের ক্ষতিসাধন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পেটে গজ রেখেই সিজার রোগীকে সেলাই, সাত মাস পর অন্য হাসপাতালে অপসারণ
গজারিয়ায় গোলাগুলির ঘটনায় ডাকাত দলের প্রধানসহ আটক ৩
দিনাজপুরে স্থানীয়দের সঙ্গে তৌহিদী জনতার সংঘর্ষে আহত ২০