রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের সার্বিক কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে মোটামুটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। প্রকল্পটিতে ব্যতিক্রমী কিছু ভালো দিকও তাদের নজরে এসেছে। তবে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কেন্দ্র পরিচালনার কার্যক্রম তদারকিসহ কিছু বিষয়ে উন্নয়নের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ কেন্দ্রটির নিরাপত্তার মান আরও উন্নত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে আইএইএর বিশেষজ্ঞ দলের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গত ১০ আগস্ট থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সরেজমিন পরিদর্শন করে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছে আইএইএর প্রি-অপারেশনাল সেফটি রিভিউ টিম (প্রি-ওসার্ট) মিশন।
প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডের আগে নিরাপত্তা যাচাইয়ের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে এই মিশন পরিচালনা করে আইএইএ।
এর ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এর উৎপাদন শুরুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেল। তবে আইএইএর পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুরোপুরি উন্নয়নের পর সংস্থাটির চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই শুরু হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি লোডিং। শিগগির এই কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রি-ওসার্ট মিশনসমূহ আইএইএর নিরাপত্তা মানদ- অনুযায়ী পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও প্রস্তাবনার মাধ্যমে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
গত ১০ আগস্ট থেকে পাবনার রূপপুরে প্রকল্প এলাকায় ওই মিশন চলাকালে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট পরিচালনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা, কার্যক্রম, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, অপারেশনাল অভিজ্ঞতা, রেডিয়েশন সুরক্ষা, রসায়ন, জরুরি প্রস্তুতি, দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনা এবং কমিশনিং ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করে প্রি-ওসার্ট দল।
এই দলে বুলগেরিয়া, চীন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ জন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এ ছাড়া যুক্ত ছিলেন আইএইএ কর্মী এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের একজন পর্যবেক্ষকও। এ বিষয়ে আইএইএর সিনিয়র নিউক্লিয়ার সেফটি অফিসার সাইমন মরগান বলেন, ‘কমিশনিং থেকে অপারেশনে যাওয়া একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ ধাপটি নিরাপদে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রূপপুরের কর্মীরা দক্ষ, পেশাদার এবং নিরাপত্তা উন্নয়নে আন্তরিক। কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি জাতীয় ও আইএইএ মান অনুযায়ী সম্পন্ন করতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মিশনের আগে, বিশেষজ্ঞ দলটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে কেন্দ্রের প্রধান প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, কর্মীদের দক্ষতা, পরিচালনার সক্ষমতাসহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে। এ সময় তারা কেন্দ্রের কমিশনিং ও প্রি-অপারেশনাল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে, কর্মক্ষমতার সূচক পরীক্ষা করে এবং কর্মীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে।
এখানকার কর্মীরা দক্ষ, পেশাদার এবং কেন্দ্রের কার্যকরী নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা উন্নত করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিয়োজিত কর্মীদের সঙ্গে প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় ফলপ্রসূ হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আদান-প্রদানের মাধ্যমে কেন্দ্রের নিরাপত্তা উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করে প্রি-ওসার্ট দলের প্রতিনিধিরা।
উত্তম চর্চা ও কিছু সুপারিশ : এই মিশনে দলটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কিছু উত্তম চর্চার বিষয়ও চিহ্নিত করেছে যা পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার হয়, এমন দেশগুলোর সঙ্গে শেয়ার করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে অন্যতম হলোরূপপুর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অত্যাধুনিক সিমুলেটর ব্যবহার করে রিফুয়েলিং মেশিন পরিচালনা শেখানো।
তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা আরও উন্নত করার জন্য কয়েকটি সুপারিশও দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলটি। এগুলো হলোঅগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ উন্নত করা যাতে দূর্ঘটনার ঝুঁকি কার্যকরভাবে কমানো যায় এবং কোনো কারণে দূর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হয়।
এ ছাড়া কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালনায় তদারকি, গুণগত মান আরও উন্নত করার পাশাপাশি যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রের কমিশনিং চলাকালীন যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা শক্তিশালী করারও পরামর্শ দিয়েছে আইএইএর বিশেষজ্ঞ দলটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ আমাদের জন্য অনেক মর্যাদার। নানা রকম নিরাপত্তা মেনেই এ ধরনের কেন্দ্র নির্মিত হয়। আইএইএর প্রি-ওসার্ট মিশন যেসব পরামর্শ দিয়েছে সেগুলো দ্রুত আমলে নেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো, জ্বালানি লোডিংয়ের সময় বা কমিশনিংয়ের পর কোনো কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা প্রশমনের জন্য জরুরি সাড়াদান কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা। আমার জানামতে, এটা এখনো হয়নি। আর রাতারাতি সম্ভবও নয়। এটা ছাড়া জ্বালানি লোডিং এবং পরবর্তী ধাপে যাওয়া আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী সমীচীন নয়। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটি কবে হবে তা কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। পাশাপাশি অন্যান্য নিরাপত্তাও পুরোপুরি নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও অমূলক ভয় কাটানোর জন্যও নানা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক মো. কবীর হোসেনের মোবাইলে গতকাল বৃহস্পতিবার একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
তবে আইএইএর প্রতিনিধিদলকে তিনি তার মন্তব্যে বলেছেন, ‘প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতার উচ্চমান অর্জন ও বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ। প্রি-ওসার্ট মিশন এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আন্তর্জাতিক মানদ- পূরণ ও দুর্বলতা চিহ্নিত করতে আমাদের সহায়তা করছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রি-ওসার্ট মিশনের সঙ্গে এই সম্পৃক্ততা একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক স্থাপনা গড়ে তোলা এবং শক্তিশালী পারমাণবিক নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকার প্রকাশ করে। বাংলাদেশ এ ধরনের আইএইএ পিয়ার রিভিউ মিশনকে আত্মমূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণের সক্ষমতা যাচাই ও জাতীয় পারমাণবিক কর্মসূচির দুর্বলতা চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।’
আইএইএ-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কাছে এই মিশনের একটি খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তারা। এখন এ খসড়ায় তথ্যগত মন্তব্য যোগ করার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। আইএইএ এসব মন্তব্য পর্যালোচনা শেষে তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে।
গত ৯ আগস্ট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক মো. কবীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশা করছি, এ বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতেই প্রথম ইউনিট থেকে “পাওয়ার স্টার্টআপ” বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।’
দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদন কী আগামী বছরে শুরু হবে? এমন প্রশ্নের জবাব সরাসরি না দিয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. কবীর হোসেন বলেছিলেন, প্রথম ইউনিট শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ইউনিট নিয়ে মন্তব্য করা যাবে। তবে নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করে সব কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি উচ্চপ্রযুক্তির এবং নিরাপত্তানির্ভর প্রকল্প। প্রতিটি ধাপ সুপরিকল্পিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়, যাতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম হয় ও সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। প্রি-ওসার্ট মিশনের পর ফাইনাল ওসার্ট মিশন হবে। এখন আইএইএর পরামর্শগুলো কার্যকর করার পর তাদের অনুমতি মিললে সুবিধাজনক সময়ে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোড করা হবে। এই জ্বালানি লোড করার পর সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে লাগবে প্রায় ৯০ দিন।
তারা আরও জানান, গ্যাস, কয়লা কিংবা অন্যান্য জ্বালানির মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অতি দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারে না। কারণ নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। সেজন্য জ্বালানি লোড করার পর ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে প্রায় ১০ মাস লাগে।
