গণ অধিকার পরিষদ নেতা নুরুল হক নুর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ভয়ংকর পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কে বা কারা এর সঙ্গে যুক্ত সেটি স্পষ্ট না হলেও দেশি-বিদেশি চক্রান্তের কথা আসছে। এ ঘটনাকে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনার অংশ মনে করেন রাজনৈতিক নেতারা।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন ঘিরে আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। বিপক্ষের শক্তি নির্বাচন আটকাতে দেশকে অস্থির করে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। নুরের ওপর হামলা ‘অ্যাসিড টেস্টে’র মতো। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া কী ঘটে তার ওপর নির্ভর করছে আগামীতে আরও কী ধরনের ঘটনা ঘটাবে নির্বাচনবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তি। তারা পারবে কি পারবে না সেটিও ভাবনায় আসবে।
গত শুক্রবার রাতে হঠাৎ করে গণসংহতি আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর আক্রান্ত হন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকী আক্রান্ত হন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে দাবি জোরালো হয়ে উঠছে। বিপক্ষের দাবিও কম জোরালো নয়। এ অবস্থায় অনাস্থা-অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তবে নির্বাচনের দাবিতে অনঢ় বিএনপির সঙ্গে ভেতরে ভেতরে অন্তর্বর্তী সরকারের এক ধরনের সখ্য গড়ে ওঠায় বিপক্ষের শক্তি অনেকটাই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচন প্রশ্নে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে (এনসিপি) সরকারের সম্পর্কের টানাপড়েন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, জামায়াত ও এনসিপি না চাইলে নির্বাচন কি আসলেই হবে? এসব অনেক প্রশ্ন অতীত করে ফেলতে চায় সরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল কর্তা-ব্যক্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের বড় একটি অংশ মনে করে নির্বাচন নিয়ে গড়িমসি করে নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় থাকতে পারার সুযোগ কমে আসছে। তাই একটি নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে বিদায় নিতে চায় সরকার। সেজন্য গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল দেওয়া হবে জানিয়ে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে বিএনপিসহ নির্বাচনের পক্ষের একাধিক রাজনৈতিক শক্তি সাধুবাদ জানিয়েছে। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জামায়াত, এনসিপিসহ অন্য একাধিক রাজনৈতিক শক্তি। ৫ আগস্ট-পরবর্তীতে রাজনৈতিক শক্তির পরস্পরবিরোধী অবস্থানে নির্বাচনী অনিশ্চয়তা দূরই হচ্ছে না। যদিও সরকারের মধ্যে একেবারেই ক্ষুদ্র একটি অংশ নির্বাচন নিয়ে আরেকটু সময় নিতে চায়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে সামনে আরও ভয়ংকর ঘটনাও ঘটতে পারে। নুরের ওপর হামলার ঘটনাকেও তিনি নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার এক ধরনের খেলা বলে মন্তব্য করেন। তবে সবকিছুর সমাধানই নির্বাচন। এটিই শেষ কথা জানান শাহ আলম।
আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন রুখে দেওয়ার শক্তি কারও নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই জাতীয় নির্বাচন হবে, আর সেই নির্বাচন পাহারা দেবে এ দেশের জনগণ।’ গতকাল শনিবার নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়া মাঠে জেলা বিএনপির সম্মেলন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের সংবাদ সম্মেলন থেকে বলছে, পিআর না হলে নির্বাচন হতে দেবে না। আমি ঘোষণা দিচ্ছি, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে রমজান শুরু হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচন কেউ রুখতে পারবে না। সেই শক্তি কারও নেই। যারা নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে চায়, তারা নানা বাহানা করছে।’
আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘স্ট্রংলি বলছি নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে হবে। কোনো শক্তিই এটি প্রতিহত করতে পারবে না।’
গতকাল শনিবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে সমসাময়িক বিষয়ে ব্রিফিংকালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। আপনারা আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পরিসংখ্যান নিয়ে দেখেন গত বছরের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটুকু অবনতি হয়েছে, আদৌ হয়েছে কি না।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, আমরা জটিল রাজনীতির মধ্যে আছি। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকাল গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে দেখতে গিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, পুলিশ ও যৌথ বাহিনী নুরসহ গণ অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করেছে। তিনি এই হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে-বিপক্ষে উত্তপ্ত রাজনৈতিক মাঠ সামাল দিতে ধীর পায়ে নির্বাচনের দিকে হাঁটার কৌশল অনুসরণ করেছে সরকার তথা ইসি। এরই অংশ হিসেবে আগে নির্বাচনের মাস ঘোষণা করা হয়েছে। তারপর রোডম্যাপ দেওয়া হয়েছে। শেষ হবে ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে। নির্বাচন নিয়ে লম্বা সময় নিয়ে ইসিও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনের পক্ষের ও বিপক্ষের কোনো শক্তিকেই দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলার সুযোগ দিতে চায় না সরকার। তাই একটু একটু করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার ও ইসি। যাতে নির্বাচনকে ইস্যূ করে কেউ বড় কোনো জটিলতার সৃষ্টি করতে না পারে।
সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্যে করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা ওয়াদা ভঙ্গ করে যে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন, সেটি একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে ভন্ডুল করার উদ্দেশ্যমূলক নীলনকশা।
গত শুক্রবার কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের নির্বাচনী দায়িত্বশীল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, সংস্কার এবং বিচার কার্যক্রম দৃশ্যমান না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার প্রতিশ্রুতি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করেই প্রধান উপদেষ্টা একতরফাভাবে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। এতে জনগণের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার কি কোনো চাপে পড়ে পরিকল্পিত নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
