বৃহত্তর সুন্নি জোটের আত্মপ্রকাশ, অংশ নেবে নির্বাচনে

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ০১:৫৮ এএম

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুন্নি মতাদর্শী ৩টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) এর সমন্বয়ে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ নামে নতুন জোট আত্মপ্রকাশ করেছে। গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে নবগঠিত এই জোটের ১৭ দফা দাবি ও ২১ দফা ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জোটের অন্যতম শরীক দল ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জয়নুল আবেদীন জুবাইর বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই এদেশ হচ্ছে ইসলামী রাজনীতির উর্বর ক্ষেত্র। তাই দেশ ও জাতিকে সর্বপ্রকার মানবগড়া মতবাদের অক্টোপাস থেকে মুক্ত করে কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ ইসলামী সমাজ গড়তে হবে।

তিনি বলেন, বিগত ৫ আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। এ অভ্যুত্থানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও দলমত-নির্বিশেষে প্রায় সবাই সমর্থন এবং অংশগ্রহণ করে। যেখানে আত্মাহুতি দিয়েছে অসংখ্য তরতাজা অমূল্য প্রাণ। ছাত্র-জনতার এহেন অমূল্য আত্মত্যাগের প্রতি রইল আমাদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। ছাত্র-জনতার রক্ত স্নাত আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১ বছর অতিবাহিত হতে চললেও অদ্যাবধি জাতীয় জীবনে কোনোরূপ সুস্থতা ও স্থিতিশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ক্রমাগত বেড়েই চলেছে লুটতরাজ, মব ভায়োলেন্স, চাঁদাবাজি তথা অবাঞ্ছিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। থামছেই না মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজারসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর তথা অগ্নিসংযোগের মতো গর্হিত অপরাধ প্রবণতা। সন্দেহের বশীভূত হয়ে গণপিটুনিতে হত্যার মতো অপরাধ ভয়াল রূপ ধারণ করেছে।

অনস্বীকার্য বাস্তবতা হলো, প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব অযাচিত ঘটনা সংঘটিত হলেও প্রশাসনের নির্বিকার। ফলে জনমনে ক্রমাগত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের প্রতি জনগণের চরম আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ কঠিন পরিস্থিতি থেকে দেশ-জাতির উত্তরণ খুবই জরুরি।

ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এর সময় ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা মনে করি আসন্ন এ নির্বাচন জাতীয় জীবনে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ এর অন্তর্ভুক্ত তিনটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রত্যাশী।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন-ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ আল্লামা জয়নুল আবেদীন জুবাইর। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন-বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব অধ্যক্ষ আল্লামা স উ ম আবদুস সামাদ। নবগঠিত জোটের তিন শীর্ষ নেতা বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান মাওলানা এমএ মতিন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ছৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান ছৈয়দ সাইফুদ্দীন আল হাসানী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

সংবাদ সম্মেলনে মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, অধ্যক্ষ আল্লামা এস এম ফরিদ উদ্দীন, আল্লামা আবু সুফিয়ান আবেদী আলকাদেরী, অ্যাডভোকেট আবু নাছের তালুকদার, এম সোলায়মান ফরিদ, অধ্যক্ষ এম ইব্রাহীম আখতারী, আল্লামা খাজা আরিফুর রহমান তাহেরী, আল্লামা মোশাররফ হোসেন হেলালী, মাওলানা আশেকুর রহমান হাশেমী, মাওলানা বাকি বিল্লাহ আজহারী, মাওলানা রুহুল আমিন ভূঁইয়া চাঁদপুরী, স ম হামেদ হোসাইন, এইচএএম মুজিবুল হক শাকুর, এ এম মঈনউদ্দীন চৌধুরী হালিম, মাওলানা ওয়াহেদ মুরাদ প্রমুখ।

বৃহত্তর সুন্নি জোটের ১৭ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, জাতীয় নীতি নির্ধারণে সব নিবন্ধিত দলের অংশগ্রহণ ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতকরণ, সরকারের দেওয়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা বাস্তবায়নের পাশাপাশি একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও সব নিবন্ধিত দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে সরকারের প্রভাবমুক্ত রেখে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা, জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া এবং সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কম্বিং অপারেশন পরিচালনা করা, অবৈধ অর্থ পাচার রোধ এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা, নির্বাচনের পূর্বে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা, দুর্নীতিবাজ, আদালতের রায়ে দণ্ডিত সন্ত্রাসী, ঋণখেলাপি, বিদেশে অর্থ পাচারকারী ও কালো টাকার মালিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, বিভিন্ন সেক্টর থেকে লোকজনকে পদত্যাগে বাধ্য করার মতো গর্হিত কাজ বন্ধ করা, এ সাধারণের গুম, খুনসহ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা থেকে ছাঁটাই বন্ধ করা ও ইতিমধ্যে ছাঁটাইকৃতদের অবিলম্বে পুনর্বহাল করা, নারী কমিশন প্রদত্ত রিপোর্ট বাতিল করা, কোরআন সুন্নাহ বিরোধী আইন প্রণয়ন থেকে বিরত থাকা, জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসন ও আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, জনগণের সর্বশেষ আস্থার ঠিকানা সেনাবাহিনীকে কোনো বিতর্কে না জড়িয়ে এ বাহিনীর গৌরবময় ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন করা, গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ করা, চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি ইস্ট ইন্ডিয়া মার্কা কোম্পানির হাতে তুলে না দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে পরিচালনা করা, মানবিক করিডরের নামে আরাকানী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে দেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া, গত এক বছরে ভাঙচুরকৃত শতাধিক, মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা ও হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি নিশ্চিত করা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত