সাংবাদিক বুলুর মৃত্যু ঘিরে রহস্য বাড়ছে

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩১ এএম

সাংবাদিক ওয়াহিদুজ্জামান বুলুর মৃত্যু ঘিরে রহস্যের জট ক্রমেই জটিল হচ্ছে। তার স্বজনদের ভাষ্য, কখনোই তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন না। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা সম্ভব। খুলনার সাংবাদিকসমাজ বুলুর মৃত্যুকে রহস্যজনক আখ্যা দিয়ে প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচনের দাবি জানিয়েছে।

গত রবিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী (রূপসা সেতু) সেতুর ২ নম্বর পিলারের বেজমেন্ট থেকে নৌ-পুলিশ সাংবাদিক ওয়াহিদুজ্জামান বুলুর মরদেহ উদ্ধার করে।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, ওয়াহিদুজ্জামান বুলু গত রবিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর বাগমারা আদর্শ পল্লী এলাকায় তার শ্বশুরবাড়ি থেকে নাশতা করে বের হন। দুপুর ১২টার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে বুলুর শ্যালকরা রূপসা সেতুর নিচে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর পান।

বুলুর ছোট শ্যালক মনিরুজ্জামান বাবু জানান, গত ১১ মে সকালে তার বোন (বুলুর স্ত্রী) এলিজা পারভীন মর্নিং ওয়াক করতে বের হয়ে আর বাড়ি ফিরে আসেননি। এ ঘটনার দুই-তিন দিন পর বুলু স্ত্রীর নিখোঁজের ঘটনায় নগরীর সোনাডাঙ্গা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর থেকে তার স্ত্রীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার পর থেকে বুলু মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন। এ ছাড়া, তিনি একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন এবং সেই টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন।

কোস্ট গার্ডের একটি সূত্র জানায়, গত রবিবার দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে সাংবাদিক ওয়াহিদুজ্জামান বুলু রূপসা সেতুর ওপর ঘোরাফেরা করছিলেন। সে সময় তার সঙ্গে একজন মহিলা ছিলেন। তাদের মধ্যে ঝগড়া হতে দেখা গেছে। এরপর বুলুকে সেতু থেকে লাফ দিতে দেখা যায়। ওই মহিলা তখন চিৎকার করে লোকজন ডাকেন। এরপর থেকে তিনিও নিখোঁজ রয়েছেন।

বুলুর পারিবারিক সূত্র ও এলাকার লোকজন জানান, প্রায় এক বছর আগে বুলু ডুমুরিয়া উপজেলার তানিয়া সুলতানা নামে এক নারীকে তার সন্তানসহ দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তিনি তানিয়ার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়েছিলেন। এ টাকা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর বুলু নগরীর শিববাড়ী মোড়ের বাড়ি বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা পান। সম্প্রতি তানিয়া সুলতানা লোকজন নিয়ে বুলুকে মারধর করে তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া, তানিয়া ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা নিয়ে বুলুকে তালাক দেন। এদিকে, বুলুর বাসার কাজের মহিলা রাবেয়া তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের দাবি তুলে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। এসব ঘটনায় বুলু চরম মানসিক চাপে ছিলেন।

বুলুর ছোট ভাই আনিসুজ্জামান দুলু জানান, তিনি ব্যবসার কারণে ঢাকায় থাকেন। গত শনিবার রাতে তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন। তখন বুলু জানিয়েছিলেন, তিনি সুস্থ ও ভালো আছেন। কিন্তু রবিবার দুপুর ১২টার পর তিনি বেশ কয়েকবার ফোন করলেও বুলুর মোবাইল বন্ধ পান। রাতে তিনি তার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পান। তিনি দাবি করেন, তার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে এ রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান।

বুলুর শ্যালক জুবায়ের জানান, বেশ কিছুদিন ধরে বুলুর মোবাইলে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন আসত। তিনি ফোন রিসিভ করে বাইরে গিয়ে কথা বলতেন এবং তখন তার শরীর কাঁপত।

বুলুর ছোট শ্যালক মনিরুজ্জামান বাবু বলেন, তার বোন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে বুলু চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে তারা বুলুর অন্য কোনো সমস্যা সম্পর্কে জানতেন না। সোমবার তারা বুলুর দ্বিতীয় বিয়ে ও অন্যান্য কিছু ঘটনার কথা জানতে পেরেছেন। তিনি মনে করেন, এসব ঘটনার তদন্ত করলে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে।

বুলুর শ্যালকের স্ত্রী নুরনাহার পারভীন বলেন, তার ননদ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে বুলু মানসিকভাবে অশান্তিতে ছিলেন। তিনি কান্নাকাটি করতেন এবং ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতেন না। এজন্য তারা বুলুকে তাদের কাছে থাকতে বলেছিলেন। তবে তিনি বিশ্বাস করেন না যে বুলু আত্মহত্যা করেছেন। তিনি বলেন, বুলু সুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। তাই তারা এটিকে হত্যা বলেই মনে করছেন এবং পুলিশের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

কেএমপি সদর থানার নৌ-পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মহিদুল হক জানান, মরদেহের সুরতহালে দেখা গেছে, মুখ থেঁতলানো, দুই হাত ও বাঁ পা ভাঙা। এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।

খুলনা নৌ-পুলিশ সুপার (এসপি) ডা. মঞ্জুর মোর্শেদ জানান, সাংবাদিক বুলুর মৃত্যুর ঘটনায় সোমবার একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। এ মৃত্যুকে আপাতত রহস্যজনক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রূপসা সেতু ও এর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া, উদ্ধার হওয়া বুলুর মোবাইল ফোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তের পর রহস্য উন্মোচন করা হবে।

এদিকে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার দুপুরে সাংবাদিক বুলুর মরদেহ খুলনা প্রেস ক্লাবে আনা হয়। সেখানে খুলনা প্রেস ক্লাব, খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়ন, খুলনা টিভি রিপোর্টার্স ইউনিটি, খুলনা প্রেস ক্লাব মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠন পুষ্পমাল্য অর্পণ করে শেষ শ্রদ্ধা জানায়। পরে প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে জানাজা শেষে বুলুর মরদেহ নগরীর গোয়ালখালি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সিনিয়র সাংবাদিক বুলু দৈনিক বঙ্গবাণী পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। তিনি অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজ, চ্যানেল ওয়ান, ইউএনবি ও দৈনিক প্রবাহ পত্রিকাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। তিনি খুলনা প্রেস ক্লাব ও খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের (কেইউজে) সদস্য ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত