আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণে উৎসাহ দিয়েছে ইসলাম

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৩৮ এএম

ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষকে আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকনির্দেশনা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তার জন্যও বাস্তবসম্মত নীতিনির্ধারণ করা হয়েছে। মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও স্বাধীনতা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মূল্যবান। তাই এগুলো রক্ষায় যেমন অন্যায়ের পথ অবলম্বন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তেমনি অন্যায়ের শিকার হলে আত্মরক্ষার বৈধতা ও অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। ইসলামে আত্মরক্ষা মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত এবং পরিস্থিতিভেদে তা ইমানেরই দাবি।

পবিত্র কোরআন আত্মরক্ষাকে শুধু অনুমোদনই করেনি, বরং এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। অন্যায়ের মোকাবিলা করা, জুলুম প্রতিহত করা এবং শত্রুর আক্রমণ ঠেকানোকে ইসলাম ন্যায়সংগত ও প্রয়োজনীয় কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একইভাবে নিজের ধ্বংস ডেকে আনা থেকেও বারণ করা হয়েছে। এই নির্দেশনা মানুষকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের শিক্ষা দেয়।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং যে তোমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, তোমরাও তার ওপর আক্রমণ করো, যেমনভাবে সে তোমাদের ওপর আক্রমণ করেছে।’ (সুরা বাকারা ১৯৪) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে ফেলো না।’ (সুরা বাকারা ১৯৫) আরও বলা হয়েছে, ‘অত্যাচারিত হওয়ার পর যারা প্রতিশোধ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’ (সুরা শুরা ৪১)

আত্মরক্ষার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি ইসলাম প্রশিক্ষণের প্রতিও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। শরীরচর্চা, যুদ্ধকৌশল ও আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণকে ইসলামের শিক্ষা ও অনুশীলনের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর তাদের মোকাবিলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ব বাহিনী প্রস্তুত করো, তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের এবং তারা ছাড়া অন্যদেরকেও, যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদের জানেন। আর তোমরা যা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো, তা তোমাদের পরিপূর্ণ দেওয়া হবে। তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ (সুরা আনফাল ৬০)

দুর্বল মুসলিমের চেয়ে শক্তিশালী মুসলিম আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় অধিক প্রিয়। যদিও উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম) এ দলিলগুলো প্রমাণ করে, আত্মরক্ষার জন্য শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করাও ইসলামের শিক্ষা। হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি নিজের জীবন, পরিবার বা সম্পদ রক্ষায় নিহত হয়, সে শহীদের মর্যাদা লাভ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ, জীবন, পরিবার বা ইজ্জত রক্ষায় নিহত হয়, সে শহীদ।’ (তিরমিজি)

আরও একটি হাদিসে এক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, ‘যদি কেউ আমার সম্পদ নিতে আসে? রাসুল (সা.) বললেন, তুমি তা দেবে না। সে যদি আমাকে হত্যা করতে চায়? রাসুল (সা.) বললেন, তুমি তাকে প্রতিহত করবে। সে যদি আমাকে হত্যা করে? রাসুল (সা.) বললেন, তুমি শহীদ। আমি যদি তাকে হত্যা করি? রাসুল (সা.) বললেন, সে জাহান্নামি। (সহিহ মুসলিম) আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে আঘাত বা হত্যাকাণ্ড ঘটলে তার দায়ভার আত্মরক্ষাকারীর ওপর বর্তায় না। এমনকি ধর্ষণ বা চুরির মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও ইসলাম আত্মরক্ষাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং তা ন্যায়সংগত প্রতিরোধ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সম্ভ্রম রক্ষায় আত্মরক্ষা করলে শাস্তি নেই। ওমর (রা.)-এর যুগে একজন বাঁদি ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে আক্রমণকারীকে পাথর ছুড়ে হত্যা করলে তিনি বলেন, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিহত হয়েছে, তার কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক)

শামের এক নারীও একইভাবে আত্মরক্ষায় হত্যার ঘটনা ঘটালে তৎকালীন শাসক জাহহাক ইবনে কাইস (রা.) তদন্ত করে চোরের দোষ প্রমাণিত হওয়ায় রক্তপণ বাতিল করেন। (ইবনে আবি শায়বা)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত