সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মব সহিংসতা বেড়েছে

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:২৭ এএম

চলতি বছরের আগস্ট মাসে এর আগের মাসের (জুলাই) তুলনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নিপীড়নের ঘটনা দ্বিগুণ বেড়েছে। পাশাপাশি মব সহিংসতার মাধ্যমে গণপিটুনির ঘটনাও আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। আগস্টে কমপক্ষে ৩৯টি ঘটনায় ৭২ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্ট মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে। এ সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৮টি ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও অন্তত ৩৯ জন আহত হয়েছেন। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এসব তথ্য জানিয়ে বলছে, আগস্ট মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। গত মঙ্গলবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে একজন সাংবাদিককে হত্যা, হামলায় আহত হয়েছেন ৩৩ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন পাঁচজন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১১ জন ও গ্রেপ্তার হয়েছেন একজন সাংবাদিক। এ ছাড়া একটি মামলায় দুজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং অন্তত ১৯ জন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। গত ৭ আগস্ট গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় মসজিদ মার্কেটের সামনে মো. আসাদুজ্জামান তুহিন (৩৮) নামে এক সাংবাদিককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর কাকরাইল বিজয়নগরে জাতীয় পার্টি কার্যালয়ের সামনে গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে জাতীয় পার্টির সংঘর্ষের পর গণ অধিকার পরিষদের কর্মসূচিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হামলায় ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া এই ঘটনার জেরে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনার বিষয়টি উল্লেখ করে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব সংঘর্ষের ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ২৯ ও ৩০ আগস্টে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকাবাসীর সহিংসতায় চার শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে আগস্ট মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এইচআরএসএস বলছে, মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি হত্যা বেড়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতা, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, শ্রমিকদের ওপর হামলা, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদানের মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্ট মাসে কমপক্ষে ৬৭টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’র ঘটনায় চারজন নিহত এবং ৫১৪ জন আহত হয়েছেন। তবে, আগস্ট মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা সংখ্যা জুলাই মাসের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

আগস্ট মাসে অন্তত ৬৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে উল্লেখ করে এইচআরএসএস বলছে, তাদের মধ্যে ৩৩ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী এবং এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৮ জন নারী ও কন্যাশিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে তিনজনকে। এ ছাড়া ২৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১২ জন শিশু। এ ছাড়া শিশু নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্ট মাসে ১৩৩ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৭ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ১১৬ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্ট মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ১৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৭১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আগস্টে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে ৪৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ৪২৮ জন। এ ছাড়া সারা দেশে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে আরও ৮ হাজার ৩৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

নীলফামারীতে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় নিন্দা : নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডের একটি কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের জেরে শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক নিহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে এইচআরএসএস। গতকাল এক বিবৃতিতে এইচআরএসএস বলে, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সহিংসতার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া দুঃখজনক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ নিহত শ্রমিকের পরিবারের যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত