দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে জাপানের আত্মসমর্পণের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছে চীন। বর্ণাঢ্য এ অনুষ্ঠান ঘিরে শহরজুড়েই ছিল সাজ সাজ রব। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আয়োজনে এই কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের শীর্ষ নেতারা। ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনসহ ২০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। আর এই মাহেন্দ্রক্ষণকে পশ্চিমা বিশ্বকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার জানান দেওয়ার মঞ্চ হিসেবে বেছে নেয় কমিউনিস্ট শাসিত দেশটি। অনুষ্ঠানে পুতিন-কিম ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, বেলারুশ, ইরান, জিম্বাবুয়ে, সার্বিয়া, স্লোভাকিয়া, কিউবা এবং মিয়ানমারের রাষ্ট্রপ্রধানরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন নিজেদের বিজয় দিবস উদযাপনের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদ ও মেরূকরণের বিকল্প হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। একইসঙ্গে ব্রিকস ও গ্লোবাল সাউথের জন্যও চীনের এই আয়োজন ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছে এ অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় চীনের জাতীয় সংগীত ও শি জিনপিংয়ের বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় এ কুচকাওয়াজ। ভাষণে শি জিনপিং বলেছেন, বিশ্ব এখন শান্তি নাকি যুদ্ধএই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, চীনের জনগণ ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং শান্তিরক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। শি জোর দিয়ে বলেন, চীনের সামরিক বাহিনী সর্বদা কমিউনিস্ট পার্টি ও জনগণের প্রতি বিশ্বস্ত।
তিনি আরও বলেন, চীন একটি মহান, অপ্রতিরোধ্য শক্তি, যা কোনো হুমকিকে ভয় পায় না। স্বনির্ভর ও শক্তিশালী এ দেশের জনগণ এবং সামরিক বাহিনী একযোগে কাজ করে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করবে। শি আশা প্রকাশ করেন, পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) চীনের মহান পুনর্জাগরণের জন্য কৌশলগত সহায়তা প্রদান করবে এবং বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়নে আরও বড় অবদান রাখবে। এরপর শি জিনপিং তিয়ান আনমেন স্কয়ারে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার সেনা পরিদর্শন করেন। তিনি তার কালো রঙের হংচি গাড়িতে দাঁড়িয়ে সেনাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। সামরিক মহড়ায় নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শন করছে চীন। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প ও মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, একাধিক রকেট নিক্ষেপ ব্যবস্থা এবং মানববিহীন যুদ্ধবিমান বা স্টেলথ ড্রোন প্রদর্শিত হয়েছে। এ ছাড়া দেখা গেছে, হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল, ওয়াইজে-২১ অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল এবং জেএল-৩ সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক মিসাইল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন নিজেদের এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুল্কের ঝনঝনানিতে এক ঘোলাটে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। আর সেটিকেই নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বেইজিং। এরইমধ্যে শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব বাড়িয়েছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এর দুই দিনের বৈঠকে যোগ দিতে সাত বছর পর প্রথমবারের মতো চীন সফরে করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র্র মোদি। পাশাপাশি গতকাল বুধবারের জমকালো কুচকাওয়াজের পাশাপাশি শি, পুতিন ও কিম নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার কোনো ইঙ্গিত দেন কি না, সেদিকেও পর্যবেক্ষকদের নজর ছিল। আলাদা আলাদাভাবে চীন-উত্তর কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া-রাশিয়ার মধ্যে এ ধরনের চুক্তি থাকলেও তিন দেশ একত্রে ন্যাটো গোছের কোনো প্রতিরক্ষা সমঝোতা বা চুক্তিতে নেই। তেমন কোনো চুক্তি হলে তা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল তো বটেই বিশ্বের গোটা সামরিক বিন্যাসেই বড় পরিবর্তন আনবে।
কুচকাওয়াজে অংশ নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুতিন এরই মধ্যে চীনের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য আরও গাঢ় করার চুক্তি সেরে ফেলেছেন। আর কিম সুযোগ পেয়েছেন বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একসঙ্গে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেকে উপস্থাপনের। এ ছাড়া উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকস ও গ্লোবাল সাউথের জন্যও চীনের এই আয়োজন ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ব্রিকস দীর্ঘদিনই যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা করে আসছে। গতকালের এই কুচকাওয়াজে চীন যেভাবে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার জানান দিয়েছে তাতে বলাই যায়, সামনের দিনগুলোতে ব্রিকসের আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার পথ সুগম হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক দক্ষিণের রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
তবে এ জমকালো আয়োজনে অনুপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়ে অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান স্মরণ করার আহ্বান জানান। ট্রাম্প লেখেন, চীনের স্বাধীনতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিশাল সমর্থন দিয়েছে, অসংখ্য আমেরিকান প্রাণ দিয়েছে। আশা করি, তাদের সাহস ও ত্যাগকে যথাযথভাবে স্মরণ করা হবে। পাশাপাশি চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের অভিযোগ এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে মিলে এ ষড়যন্ত্র করছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তবে কথার লড়াই যেমনই হোক না কেন; নিজেদের বিজয় দিবস উদযাপনের মঞ্চ থেকে নিশ্চিতভাবেই পশ্চিমাদের চোখ রাঙানি দিয়েছে চীন।
