বিদেশে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান থাকায় জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও তার স্ত্রী শেরীফা কাদেরের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। দুর্নীতিদমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত তাদের বিদেশে গমনে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন বলে জানান দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম।
আকতারুল ইসলাম বলেন, জিএম কাদের ও তার স্ত্রীর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে গত রবিবার আবেদন করেন দুদকের উপপরিচালক রেজাউল করিম। আবেদনে বলা হয়, রংপুর-৩ আসনের সাবেক সাংসদ ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ অন্যদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। জিএম কাদের ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশ ও দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। দুদক জানতে পেরেছে জিএম কাদের ও তার স্ত্রী দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। তারা পালিয়ে গেলে অভিযোগের অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তাদের বিদেশ গমন ঠেকানো দরকার। পরে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে জিএম কাদের ও তার স্ত্রীর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন ঢাকার ভারপ্রাপ্ত মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ ইব্রাহিম মিয়া।
দুদকের তথ্যমতে, মনোনয়ন বাণিজ্য ও দলীয় ফান্ডের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ২৩ মার্চ অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতিদমন কমিশন (দুদক)। দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন তাদের অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
দুদক মহাপরিচালক বলেন, জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ দুদকের গোপন অনুসন্ধানে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। এরপরই প্রকাশ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশন থেকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মনোনয়নে ১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করা হয়। এই অর্থ গ্রহণের মূলে ছিলেন দলটির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের। অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেতে জিএম কাদেরের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করেন। কিন্তু ‘চুুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করায় প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী এক নেতাকে দলীয় পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। পরে সেখানে জিএম কাদেরের স্ত্রী শেরীফা কাদেরকে মনোনয়ন দেন এবং তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, জিএম কাদের জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হয়েছেন এবং দলীয় পদ বাণিজ্য ও মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেন, যা পরে বিদেশে পাচার করা হয়। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ৩০১ সদস্য বিশিষ্ট হলেও কমিটিতে ৬০০ থেকে ৬৫০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত পদগুলোতে টাকার বিনিময়ে দায়িত্ব নিয়ে কোটি কোটি আদায় করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জিএম কাদেরের ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, জিএম কাদেরের নামে নগদ ৪৯.৮৮ লাখ টাকা, ব্যাংকে ৩৫.৯৫ লাখ টাকা এবং ৮৪.৯৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি জিপ গাড়ি রয়েছে। তার স্ত্রী শরীফা কাদেরের নামে নগদ ৫৯.৫৯ লাখ টাকা, ব্যাংকে ২৮.০৯ লাখ টাকা এবং ৮০ লাখ টাকা মূল্যের একটি জিপ গাড়ি রয়েছে। তিনি দেশে-বিদেশে (সিঙ্গাপুর, লন্ডন, সিডনি) নামে-বেনামে সম্পদ পাচার করেছেন।
দুদকের তথ্যমতে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ১৯৯৬ সাল থেকে বিভিন্ন আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন এবং সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯-২০১৪ সালে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের সরকারের তিন মেয়াদে বিরোধী দলে থাকা জাতীয় পার্টি গত বছরের জুলাই গণঅভুত্থানের পর বিপাকে পড়ে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিএম কাদেরকে খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
