শিশির ভট্টাচার্য্য বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের এক পরিচিত নাম। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে ব্যঙ্গচিত্র প্রথম পাতায় যাদের হাত ধরে ছাপা শুরু হয়েছিল, তিনি তাদের অন্যতম। তার হাজারো কার্টুন সঙ্গী হয়েছে আমাদের যাপিত ইতিহাসের সঙ্গে। একদিকে তিনি দীর্ঘদিনের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে গড়ে তুলেছেন। অন্যদিকে কার্টুনশিল্পী হিসেবেও তার আছে বিশেষ খ্যাতি। কার্টুনে সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়কে তুলির আঁচরে, রেখার তীক্ষè ব্যবহারে প্রকাশ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক তার শিল্পচর্চায় যতটা সাধনা-নিমগ্ন নিজের শিল্পকর্ম দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে যেন সে রকমই অনিচ্ছুক।
বহুদিন পর কলাকেন্দ্রে ঢুকতেই দেখতে পেলাম সেখানে বাস্তবের লজিক ভেঙে দেওয়া এক সুররিয়াল দৃশ্যপট। ১২ বছর পর শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্যরে একক প্রদর্শনী আজ ৫ সেপ্টেম্বর শুরু হচ্ছে লালমাটিয়া ডি-ব্লক মাঠের পাশে থাকা গ্যালারি কলাকেন্দ্রে। ‘দাগ-তামাশা’ নামে ঢাকা আর্ট সেন্টারে শিশিরের একক প্রদর্শনী হয়েছিল ২০১৩ সালে। শিল্পপ্রেমীদের জন্য এটি এক উৎসবের থেকে কম কিছু নয়।
এই প্রদর্শনীতে রয়েছে ৯৫টি ড্রয়িং সব কটিই রেখাচিত্র। এখানে পাওয়া যাবে বিভিন্ন সময় আঁকা কাজ, ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ২০২৩-২৫ সালেরও ড্রয়িং। সবগুলোই শিশিরসুলভ; রেখামুখর। কার্টুনে তিনি যেমন মুহূর্তের বাস্তবতা আঁকতেন, এখানে রেখার ভেতর দিয়ে অবচেতনের জগৎকে দৃশ্যমান করছেন। রেখার ওপর তার দোর্দণ্ড প্রতাপ, কম্পোজিশনের মুনশিয়ানা এবং মন-ভাবনার এক জিনিয়াস উপস্থাপন স্পষ্ট। সিরিজ জুড়ে লাইন ড্রয়িং যেখানে কোনো শেডিং বা কালার-ফিল নেই, শুধু আউটলাইন। এসব হতে পারে অবচেতনের ভাষা, স্বপ্নের টুকরো-টাকরা। রেখাগুলো অনেকটা অটোমেটিক ড্রয়িংয়ের মতো। তিনি নিজে বলেছেন, ‘যা আমি দেখি বা দৃষ্টিগোচর করি, তা আমার হাত দিয়েই বের হয়।’ অর্থাৎ, এটি অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত, কনশাস কন্ট্রোলের বাইরে গিয়ে আঁকা। আবার তিনি বলেছেন, ‘একসঙ্গে অসংখ্য বিষয় ভাবতে পারি এবং দেখতেও পারি। বিজ্ঞান এ জায়গায় হয়তো যেতেই পারবে না।’ এ থেকেই বোঝা যায়, তার আঁকায় অবচেতন মনের ভিজ্যুয়ালের পাশাপাশি সমাজ কিংবা ব্যক্তিগত বাস্তবতার প্রতিফলনও ধরা পড়ে।
শিশিরের কম্পোজিশন দেখলে রেখার ওপর তার দখল সহজেই ধরা পড়ে। প্রতিটি রেখা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছুটে চলেছে, আবার পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গড়ে তুলছে জৈবিক ছন্দ। দর্শক একটানা তাকিয়ে থাকলে যেন প্রবেশ করেন এক সুররিয়াল জগতে, যেখানে বাস্তব আর অবচেতন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এই স্বপ্নময় দুনিয়ায় মাছ উড়ছে আকাশে, হাত থেকে গাছ জন্ম নিচ্ছে, মুখ থেকে বেরোচ্ছে চোখ কিংবা ফুল। কোথাও হাস্যরস, কোথাও অস্বস্তিকর শূন্যতা দুটি অনুভূতি পাশাপাশি থেকে মানুষের জীবনযাত্রার মহাবাস্তবতাকে প্রতিফলিত করছে।
শিশির ভট্টাচার্য্যরে এই প্রদর্শনীর ড্রয়িংয়ে ব্যবহৃত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কাগজের রঙ সাদা, ধূসর ও বাদামি, যা প্রতিটি আর্টওয়ার্ককে আলাদা মুড দিয়েছে। খুবই মিনিমাল অথচ ঘনবসতিপূর্ণ কম্পোজিশনে অসংখ্য প্রতীক ছড়িয়ে আছে, আবার সেগুলো জড়িয়ে গিয়ে তৈরি করেছে একধরনের জৈবিক ছন্দ।
১৯২০ সালের দিকে সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের একটি প্রধান কৌশল ছিল অটোমেটিজম, অর্থাৎ অবচেতন মনের ভাবনা, স্বপ্ন বা অবদমিত কল্পনাকে কোনো পরিকল্পনা ছাড়া হাতে প্রকাশ করা। শিশিরের কাজগুলো সেই অটোমেটিক ড্রয়িংয়ের ধারা মনে করায়। তবে তিনি তার নিজস্ব শিল্পভাষার দাপটেই স্বতন্ত্র।
শিশিরের রেখার সরলতা ও ঘটনার ঘনত্ব একদিকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী স্ক্রল-পেইন্টিংয়ের সঙ্গে মিলে যায়, অন্যদিকে স্ট্রিম-অব-কনশাসনেস ভিজ্যুয়ালের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করে। তার কাজের বিশেষ শক্তি স্থানীয় প্রতীকের ব্যবহার। বাংলার নদীমাতৃক সংস্কৃতির মাছ, লোককাহিনির পাখি, অলক্ষ্মীর চোখ, আলপনা ও নকশিকাঁথার সূর্য বা ফুল সবই খুঁজে পাওয়া যায় তার ড্রয়িংয়ে। এগুলো বাংলার লোকশিল্প ও পটুয়া ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করে, আবার আধুনিক সুররিয়াল ধারার সঙ্গে নতুন সেতুবন্ধ গড়ে তোলে। প্রতীকগুলো তাই দ্বিমুখী একদিকে চিরায়ত অর্থ বহন করে, অন্যদিকে সমসাময়িক বাস্তবতায় নতুন ব্যাখ্যা সৃষ্টি করে।
তার প্রায় প্রতিটি ছবিতে মানুষের মুখ, চোখ, হাত, প্রাণী ও প্রাকৃতিক বস্তু মিশে গেছে। এগুলো স্বপ্ন, অবচেতন চিন্তা কিংবা ভাঙাগড়া স্মৃতির মতো। চোখ বিশেষভাবে বারবার এসেছে, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। মানুষের মুখও বহুরূপে উপস্থিত কখনো হাসছে, কখনো খুলি খোলা, কখনো ভেতরে অন্যকিছু ভরা, যা মনের জটিলতা, দ্বিধা বা ভিন্নস্তরের চেতনার প্রকাশ। পাখি, গাছ, মাছের সঙ্গে মানুষের শরীর মিলেমিশে আছে, যেন বলা হচ্ছে মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়, বরং ভেতরেই জড়িয়ে আছে।
একদিকে জীবন, অন্যদিকে ক্ষয়ের ইঙ্গিতও অঢেল। বাস্তব জীবনের খণ্ডচিত্র ও কল্পনার মেলবন্ধন ঘটেছে। স্বপ্ন ও অবচেতনের ধারাবাহিক প্রতীক যেমন চোখ, ভাঙা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, পরাবাস্তব প্রাণী এসব মিলিয়ে মনে হয় মনের ভেতরের কোলাহল দৃশ্যমান হয়েছে। অনেক কাজ ডিস্টোপিয়ান অনুভূতি তৈরি করে যেমন শূন্য চোখ, বিচ্ছিন্ন হাত, মৃত প্রাণী। এগুলো যুদ্ধ, পরিবেশ বিপর্যয় কিংবা মানবিক সংকটের রূপক। আবার কিছু মুখের হাসি বা অদ্ভুত ভঙ্গি অ্যাবসার্ড হাস্যরসও তৈরি করে। কার্টুনকার হিসেবে তার ধারালো উইট এখনো রেখায় ধরা দেয়। তিনি এখন আর কার্টুন না আঁকলেও স্যাটায়ার আঁকতে পিছপা হন না।
কলাকেন্দ্রের পরিচালক, শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পে শিশির ভট্টাচার্য্যরে অবদান বহুমাত্রিক কার্টুন, ড্রয়িং, পেইন্টিং থেকে শুরু করে শিক্ষকতা পর্যন্ত। তার এই ড্রয়িংগুলোরও একটি বিশেষ ভূমিকা থাকবে। দর্শকদের মনোযোগ দাবি করে শিশিরের এই কাজগুলো।’
শিশির ভট্টাচার্য্যরে রেখার ভাষা শুধু নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে নিহিত আছে মানব-প্রকৃতির সম্পর্ক, আনন্দ ও ভয়, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের দ্বন্দ্ব। এ যেন অবচেতনের মানচিত্র যেখানে স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন আর বাস্তব একসঙ্গে সহাবস্থান করছে। রেখার মুনশিয়ানা, প্রতীকের শক্তিশালী ব্যবহার এবং ১২ বছর পর একক প্রদর্শনীর প্রত্যাবর্তন সব মিলিয়ে এই প্রদর্শনী নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পচর্চার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
