রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ এবং সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে প্যানেল ঘোষণা করেছে শাখা ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির। রবিবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রদল সমর্থিত ও বিকালে রাকসু কর্যালয়ের সামনে শাখা ছাত্রশিবির সমর্থিত পূর্ণাঙ্গ প্যানেল প্রকাশ করা হয়। দুই দলই সংবাদ সম্মেলন করে তাদের প্যানেল ঘোষণা করে।
রাকসু, হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিন আজ রবিবার। এদিন সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া। দিনের শুরুর দিকে প্রার্থীদের তেমন সাঁড়া পাওয়া যায়নি। তবে দুপুরের পর শাখা ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ বেশ কয়েকটি প্যানেল মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও দুপুরের পর থেকে মনোনয়ন জমা দেওয়া শুরু করে। এতে চাপ বাড়ে। বিকাল ৫টা পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় থাকলেও প্রার্থীদের আরও সময় দেবে বলে জানায় নির্বাচন কমিশন। তবে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত কতজন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন সে বিষয়ে বলতে পারেনি নির্বাচন কমিশন।
রাকসুর কোষাধ্যক্ষ ও প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, আজ মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল। এখনো কিছু কিছু প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিচ্ছেন। একটু সময় বাড়িয়ে হলেও সব মনোনয়ন আজকের মধ্যে জমা নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত কতজন, কোন পদে মনোনয়ন জমা দিয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। গণনা চলছে আরও সময় লাগবে।
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল: জায়গা পেয়েছে নির্যাতিতরা
শাখা ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান। ছাত্রদল তাদের প্যানেলের কোনো নাম এখন পর্যন্ত দেয়নি। ছাত্রদল সমর্থিত এই প্যানেলে কেন্দ্রীয় সংসদে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে শেখ নূর উদ্দিন আবীর, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নাফিউল ইসলাম জীবন এবং এজিএস পদে জাহিন বিশ্বাস এষা নির্বাচন করবেন।
ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এবং জিএস নাফিউল ইসলাম জীবন সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক এবং জাহিন বিশ্বাস এষা যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদে পয়েছেন।
ছাত্রদল মনোনিত প্যানেলের সহ-সভাপতি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার দেশের বাড়ি মাদারিপুরের শিবচর উপজেলায়। গত ২০২৩ সালে বিএনপির মিছিলে অংশগ্রহণ করায় নিজ বিভাগের সিনিয়র ও ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশী শাকিবুল হাসান বাকীর হাতে মারধরের শিকার হন আবির।
জিএস প্রার্থী দপ্তর সম্পাদক নাফিউল ইসলাম জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি ২০২৪ সালের মে মাসে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিব ও তার অনুসারীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। ছাত্রলীগ নেতারা ওইদিন নাফিউল ইসলাম ও তার সহপাঠী এক বন্ধুকে মাদার বখ্শ হলের ২১৫ নম্বর কক্ষে তিন ঘণ্টা আটকে রেখে মারধর ও পিস্তল ঠেকিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বলে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া প্যানেলে ক্রীড়া ও খেলাধুলা সম্পাদক নার্গিস খাতুন, সহ-ক্রীড়া ও খেলাধুলা সম্পাদক মাহফুজুর রহমান শাওন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফী, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথী, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক স্বপ্না আক্তার, সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নুসরাত ঈশিতা, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক গাজী ফেরদৌস হাসান, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রেদোয়ানুল ইসলাম হৃদয়, মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক রাফায়েতুল ইসলাম রাবিত, সহ-মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক নূর নবী।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মারুফ হোসেন, সহ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক নাইমুল ইসলাম নাঈম, বির্তক ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, সহ-বির্তক ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক জিসান বাবু, পরিবেশ ও সমাজ সেবা সম্পাদক এ আর রাফি খান, সহ-পরিবেশ ও সমাজ সেবা সম্পাদক কুঞ্জশ্রী রায় সুলগ্ন (শুভ)। এ ছাড়াও সদস্য পদে রয়েছেন মিনারুল ইসলাম মেঘ, সাইদ হাসান ইবনে রুহুল, মাহবুব মোর্শেদ ইল্লিন ও আশরাফুল ইসলাম।
প্যানেল ঘোষণা শেষে ছাত্রদলে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের নেতারা যখন আরেকটি দলের ছায়ায় থেকে নিজেদের ক্যারিয়ার গঠনে ব্যাস্ত ছিলো তখন ছাত্রদলের নেতারা রাজপথে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লড়াইয়ে নিয়োজিত রেখেছিলো। সে সময় আমাদের যে নেতারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন আমরা তাদের দিয়েই একটা প্যানেল দিয়েছি। কিছু সময়ের ভেতরেই আপনারা দেখবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে জয়জয়াকার তৈরী হবে।’
ছাত্রদলের বিদ্রোহী প্রার্থী মিঠু
আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত শাখা ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে স্থান পাননি সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু। তিনি মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে রবিবার দুপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রাকসুর ভিপি এবং সিনেট প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। ক্যাম্পাসে গুঞ্জন রটেছে, তিনি ছাত্রদলের পদ থেকেও পদত্যাগ করেছেন। তবে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, ‘ছাত্রদলের সাংগঠনিক জায়গায় থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভিপি পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। এ ছাড়া সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। পদত্যাগের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ। এটা দল থেকে জেনে নিলে ভালো হয়।’
শিবির সমর্থিত প্যানেল: ভিপি শিবির সভাপতি জাহিদ, জিএস সাবেক সমন্বয়ক ফহিম
এদিকে বিকালে রাকসু কার্যালয়ের সামনে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আব্দুল মোহাইমিন তাদের সমর্থিত প্যানেল ঘোষণা করেন। ছাত্রশিবিরের এই প্যানেলের নাম ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। তারা তাদের প্যানেলকে ‘ইনক্লুসিভ’ হিসেবে দাবি করেছেন।
এতে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে লড়বেন শাখা ছাত্রশিবিরের বর্তমান সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। সাধারণ সম্পাদক পদে প্যানেলে হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম রেজা। সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে লড়বেন স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক সোচ্চারের সভাপতি এস এম সালমান সাব্বির।
প্যানেলে ক্রীড়া সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন হামিদুল্লাহ নাঈম, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক আবু সাইয়্যেদ সামী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে জায়িদ হাসান, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম, মহিলা সম্পাদক পদে সাইয়্যেদা হাফসা, সহ-মহিলা সম্পাদক সামিয়া জান্নাত, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পদে নাজমুস সাকিব, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সিফাত আবু সালেহ, মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে মুজাহিদুল ইসলাম, সহ-মিডিয়া সম্পাদক আসাদুল্লাহ আল গালিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে হাচান হাওলাদার এবং সহ-বিজ্ঞান সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সায়েম।
বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ইমরান লস্কর, সহ-বিতর্ক সম্পাদক নয়ন মুরসালীন, পরিবেশ ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহ-সমাজসেবা সম্পাদক মাসুমা ইসরাত মুমু। নির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দ্বীপ, সুজন চন্দ্র, মো. ইমজিয়াউল হক ও খালিদ হাসান।
প্যানেল ঘোষণার আগে ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আব্দুল মোহাইমিন বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের ৯ দফার মধ্যে অন্যতম দাবি ছিল ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। আমরা বিশ্বাস করি, সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রাকসু হবে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। যেখানে প্রতিনি শিক্ষার্থী নির্ভয়ে কথা বলতে পারবে এবং নিজের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে। আসন্ন রাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসের সকল অংশীজনকে নিয়ে একটি ইনক্লুসিভ প্যানেল সাজিয়েছে। আমরা প্যানেলে বিগত জুলাই অভ্যুত্থানে আহত, জুলাইয়ের সামনের সারির যোদ্ধা এবং বিভিন্ন মত ও বিশ্বাসের শিক্ষার্থীদের মিলন ঘটিয়েছি।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম রেজা বলেন, ‘আমি স্বতন্ত্রভাবে জিএস পদে নির্বাচন করার আকাক্সক্ষা করছিলাম। পরবর্তীতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ইনক্লুসিভ প্যানেল করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে আমি ছাত্রশিবিরের প্যানেলে নির্বাচন করার সম্মতি জ্ঞাপন করি। ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগ পেরিয়ে এসে ইসলামী ছাত্রশিবির চব্বিশের আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে। এরপর গত এক বছরে তারা ক্যাম্পাসে ছাত্রবান্ধব রাজনীতি করার চেষ্টা করেছে। সেই জায়গা থেকে আমি এই প্যানেলে যুক্ত হয়েছি।’
