ট্যারিফ নিয়ে মুখোমুখি বিকডা বিজিএমইএ-শিপিং এজেন্ট

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:২০ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক ২১টি অফডক থেকে আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ১ সেপ্টেম্বর থেকে বর্ধিত হারে ট্যারিফ নেওয়া হবে। কিন্তু এই ট্যারিফ নিয়ে শুরু থেকেই পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং শিপিং এজেন্টের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানালেও বর্ধিত হারেই ট্যারিফ নির্ধারণ চলছে। আর এই ইস্যুতে বিকডার সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে গিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ট্যারিফ কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া নতুন ট্যারিফ নির্ধারণ করা যাবে না বলে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে এই ট্যারিফ কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিকডা।

বিকডার ট্যারিফ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠানো হয়। গত ৩১ আগস্ট স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয় বেসরকারি আইসিডি-২০১৬ অনুযায়ী বিভিন্ন শিপার/এমএলও/কসনাইনি/শিপিং এজেন্ট বা ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার আদায়যোগ্য ট্যারিফ নির্ধারণ করবে কমিটি। আর তা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হলে কার্যকর হবে। কিন্তু বিকডা (বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন) ট্যারিফ কমিটির অনুমোদনের বাইরে নিজেরাই ৩০ থেকে ৬২ শতাংশ বাড়তি হারে ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর শুরু করে দিয়েছে। এ নিয়ে গত ২৪ জুলাই বিকডার সেবা গ্রহীতা সংগঠনগুলোর কাছে বর্ধিত হারের তালিকা দিয়েছিল।

বিকডার এই বর্ধিত চার্জ কার্যকর করার কোনো অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেন বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ট্যারিফ কমিটির অনুমোদন ছাড়া বিকডা একতরফাভাবে চার্জ বাড়াতে পারে না। সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

কিন্তু ট্যারিফ কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ট্যারিফ কমিটি হওয়ার পর বিগত ৯ বছরে এই কমিটির কোনো অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা ছিল না। এখন সেই ট্যারিফ কমিটি কর্তৃক ট্যারিফ নির্ধারণ বিষয়টি বাস্তবতা-বিবর্জিত।

এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘বিকডার বক্তব্য সঠিক নয়। এই ট্যারিফ কমিটি বিকডার ট্যারিফ নির্ধারণ করেছিল। এতদিন যেহেতু বাড়ানোর প্রয়োজন পড়েনি, তাই হয়তো কমিটি কাজ করেনি। এখন আবার বাড়াতে হলে কমিটি নির্ধারণ করে দেবে।’

ট্যারিফ কমিটিতে কারা রয়েছেন?

২০১৬ সালের আইসিডি নীতিমালা ১১ দশমিক ১ ও ১১ দশমিক ২ উপধারা অনুযায়ী ১২ সদস্যের একটি ট্যারিফ কমিটি রয়েছে। এই কমিটি ট্যারিফ নির্ধারণ করার কথা। এতে নৌ-মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রতিনিধি, এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, চিটাগাং চেম্বার, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশন, সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বিকডার প্রতিনিধিদের নিয়ে ট্যারিফ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কিন্তু শুধু বিকডার জন্য এমন কমিটি থাকতে পারে না বলে মন্তব্য করেন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার। তিনি বলেন, ‘বিকডা ছাড়া ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, শিপিং এজেন্টসহ অনেক সংগঠন ফি আদায় করে থাকে। তাদের ফি আদায়ের জন্য যদি কোনো ট্যারিফ কমিটি না থাকে, তাহলে বিকডার জন্য কেন ট্যারিফ কমিটি থাকবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘বিকডা যাদের সেবা দেয়, সেই সেবাগ্রহীতারা সেবাদাতার ট্যারিফ নির্ধারণ করতে পারে না।’

বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বিকডা ও অন্য সংগঠনগুলোর যখন ট্যারিফ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে, তখন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তা নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু আইন কী বলে? তা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘আইসিডি নীতিমালা অনুযায়ী ট্যারিফ কমিটি বিকডার ট্যারিফ নির্ধারণ করার কথা। এজন্য আমরা আগামীকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে সবপক্ষের উপস্থিতিতে একটি সভা আহ্বান করেছি। সেই সভায় সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ট্যারিফ নিয়ে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সহায়তা করতে ও বন্দরের ওপর চাপ কমাতে ১৯৯৬ সাল থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল বেসরকারি অফডকের। রপ্তানিমুখী প্রায় শতভাগ পণ্য এসব অফডকের মাধ্যমে বন্দরে এসে জাহাজীকরণ হয়ে থাকে। অন্যদিকে আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে ৬৫ ধরনের পণ্য অফডক হয়ে আমদানিকারকের হাতে পৌঁছে। বেসরকারি এই ২১টি অফডকে বর্তমানে ২০ ফুট সাইজের একটি কনটেইনারের স্টাফিং প্যাকেজ ৬ হাজার ১৮৭ টাকা এবং ৪০ ফুট সাইজের জন্য ৮ হাজার ২৫০ টাকা আদায় হলেও প্রস্তাবিত বাড়তি দরে তা ৯ হাজার ৯০০ এবং ১৩ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একইভাবে বন্দর হয়ে অফডকের কনটেইনারের পরিবহন খরচ ২০ ফুট সাইজের জন্য ১ হাজার ৫০০ এবং ৪০ ফুট সাইজ ৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে আড়াই হাজার ও ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে গ্রাউন্ড রেন্ট, লিফট অন-লিফট অব, ডকুমেন্টেশনের পাশাপাশি স্টোররেন্ট বাড়ছে কনটেইনার প্রতি ৩০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে দেখা যায়, একটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে গড়ে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা করে বাড়তে পারে। আর এই বর্ধিত চার্জ নিয়েই বিপত্তি দেখা দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত