জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণা গতকাল মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। ৩৩ বছর পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে ‘ছাত্র সংসদ’টির ১০ সংসদের ভোটগ্রহণ। ভোটগ্রহণ হবে আবাসিক হলগুলোতে। কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি পদে এবং হল সংসদে ১৫টি পদে ৬৫৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবার মোট ভোটার ১১ হাজার ৮৫৭ জন। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত জাকসু নির্বাচন নয়বার অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম জাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭২ সালে। এরপর ১৯৭৩, ১৯৭৪, ১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১ এবং সর্বশেষ ১৯৯২ সালে জাকসু নির্বাচন হয়। প্রথম নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন গোলাম মোর্শেদ ও বোরহানউদ্দিন রোকন। প্রথমবার হল সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে। সেবার তিনটি হলে নির্বাচন হয়। সর্বশেষ ১৯৯২ সালের নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত প্যানেল থেকে ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন মাসুদ হাসান তালুকদার ও শামসুল তাবরীজ। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ে, একজন ছাত্রের বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সংঘর্ষের জেরে প্রশাসন জাকসু ও হল সংসদ বাতিল করে। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি।
এবারের নির্বাচনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত প্যানেলসহ আটটি প্যানেলে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রথমবারের মতো গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বামপন্থি শিক্ষার্থীদের তিনটি আলাদা প্যানেল রয়েছে। স্বতন্ত্র প্যানেল রয়েছে দুটি। এ ছাড়া অনেক প্রার্থী এককভাবে নির্বাচন করছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে ২৭টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে পদাধিকারবলে সভাপতি পদে উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ পদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার মনোনীত হন। বাকি ২৫টি পদে নির্বাচন হয়। এবার ২৫টি পদের বিপরীতে ১৭৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে সহসভাপতি (ভিপি) পদে ৯, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৮, সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নারী পদে ৬, সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পুরুষ পদে ১০, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে ৯, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক পদে ৬, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ৮, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ৮, সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ৮, নাট্য সম্পাদক পদে ৫, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ৩, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) পদে ৬, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (পুরুষ) পদে ৬, তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে ৭, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক পদে ৮, সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে ৭, সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) পদে ৭, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক পদে ৭, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে ৭, সংরক্ষিত তিনটি কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে ১৬ এবং সংরক্ষিত তিনটি কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে ২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫টি পদের মধ্যে ১৩টি উন্মুক্ত পদে ছাত্র ও ছাত্রী উভয়ে প্রার্থী হতে পারেন। বাকি ১২টি পদের মধ্যে ৬টি করে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আলাদাভাবে নির্ধারিত। ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত পদে শুধু ছাত্ররা এবং ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত পদে শুধু ছাত্রীরা প্রার্থী হতে পারেন। তবে ভোট দিতে পারেন সবাই।
উন্মুক্ত ১৩টি পদে ৯৫ জন প্রার্থী হয়েছেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ১১ জন। পুরুষ প্রার্থী ৮৪ জন। সহসভাপতি (ভিপি) পদে ১০ জন প্রার্থীর মধ্যে কোনো নারী নেই। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১ জন নারী। কেন্দ্রীয় সংসদে ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ৬টি পদে ৩৫ এবং ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত ৬টি পদে ৪৯ জন প্রার্থী হয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ১০টি হল সংসদে ১৫০টি পদের মধ্যে ৫৯টিতে কোনো প্রার্থী নেই। ৬৭টি পদে ১ জন করে প্রার্থী রয়েছেন। জাকসুতে এবার মোট ভোটার ১১ হাজার ৮৫৭ জন। এর মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ ছাত্র এবং ৪৯ শতাংশ ছাত্রী। কেন্দ্রীয় ও হল সংসদ মিলে প্রার্থী ৬৫৪ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী ১৭২, যা মোট প্রার্থীর ২৭ শতাংশ। ছাত্র প্রার্থী ৪৮২, যা মোট প্রার্থীর ৭৩ শতাংশ। দুটি হল সংসদে নির্বাচন হচ্ছে না।
ছাত্রদের ১১টি এবং ছাত্রীদের ১০টি হলের মধ্যে ছাত্রীদের দুটি হল সংসদে প্রার্থীদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এবং কিছু পদে প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন হবে না। এর মধ্যে বেগম সুফিয়া কামাল হলে ১০টি পদে ১ জন করে প্রার্থী রয়েছেন, বাকি ৫টি পদ ফাঁকা। নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ৬টি পদে ১ জন করে প্রার্থী রয়েছেন, বাকি ৯টি পদ ফাঁকা।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ২৫ জন প্রার্থী : কেন্দ্রীয় সংসদে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ২৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বামপন্থি শিক্ষার্থীদের একটি অংশের সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল থেকে ৭ জন আদিবাসী, ৫ জন সনাতন, ৩ জন বৌদ্ধ এবং ২ জন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাগছাস সমর্থিত ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ থেকে ১ জন আদিবাসী প্রার্থী রয়েছেন। ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলে ১ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রার্থী রয়েছেন। আব্দুর রশিদ জিতু-শাকিল আলী সমর্থিত ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ এবং জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ থেকে ১ জন করে সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া ৪ জন প্রার্থী এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রচারণায় প্রার্থীদের ইশতেহার : গত ২৯ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত প্রার্থীদের প্রচারণার সময় ছিল। প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালিয়েছেন। কেউ গান গেয়ে, কেউ শর্ট ফিল্ম বানিয়ে, কেউ টাকার নোটের আদলে লিফলেট ও হ্যান্ডবিল তৈরি করে প্রচার করেছেন। প্রচারণায় প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতি দূর করে গঠনমূলক ও ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইশতেহারে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ডাইনিং-ক্যান্টিনে খাবারের মানোন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষ সংকট নিরসন, নারীসহ সবার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমৃদ্ধকরণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। ছাত্রদল মনোনীত প্যানেল ৮ দফা এবং ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল ৯ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া : আগামীকাল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ ব্যালট পেপারের মাধ্যমে হবে। ভোট প্রদানের জন্য শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃক ইস্যুকৃত ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র, হল প্রভোস্ট কর্র্তৃক স্বাক্ষরিত ছবিযুক্ত লাইব্রেরি কার্ড, হল ইনডেক্স কার্ড বা হল প্রভোস্ট কর্র্তৃক স্বাক্ষরিত ছবিযুক্ত প্রত্যয়নপত্রের যেকোনো একটি প্রদর্শন করে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে একজনকে নিয়ে ভোট দিতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি হলে ২২৪টি বুথ স্থাপন করা হবে। প্রতি হলে অন্তত একজন করে ৬৭ জন পোলিং অফিসার থাকবেন, যারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এ ছাড়া ৬৭ জন সহায়ক পোলিং অফিসার থাকবেন, যারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা।
এক ভিপি প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল : জাকসুর ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী অমর্ত্য রায়ের প্রার্থিতা ভোটার ও প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার দুপুরে নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বাতিল করলে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন। গতকাল বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি বিশ্বজিৎ দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ তার প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আপিল করলে হাইকোর্টের চেম্বার আদালত সেই রায় স্থগিত করে।
জিএস প্রার্থীর প্রার্থিতা প্রত্যাহার : জাকসু নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদ থেকে ছাত্রদলের বিদ্রোহী প্রার্থী সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে গত ২৮ আগস্ট নির্বাচন উপলক্ষে ছাত্রদল ২৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে। প্যানেল ঘোষণার পর ওইদিন বিকেলে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া সংবাদ সম্মেলন করে স্বতন্ত্র সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার : জাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। আবাসিক হলে অবস্থানরত সব প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে আজ দুপুর ১২টার মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসে প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অতিথিসহ যেকোনো বহিরাগত ব্যক্তির অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনকালে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ পরিচয়পত্র বহন করতে বলা হয়েছে। জাকসু নির্বাচন কমিশন কর্র্তৃক অনুমোদিত যানবাহন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
থাকবে হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য : নির্বাচন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে কিছু পুলিশ সদস্য সিভিল পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনীকে উপস্থিত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আনসার সদস্যরাও শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকবেন।
সার্বিক বিষয়ে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার বলেন, ‘আগামী ১১ তারিখ একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে আমরা সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান, জাকসুতে ভোট প্রদান তাদের অধিকার। তাই তারা যেন ভোট প্রদানে অংশগ্রহণ করে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করে।’
