জাহাজে ছোট চুরিতে বড় ঝুঁকি

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:২৫ পিএম

রিক্যাপের ভাষায় চুরি আর চট্টগ্রাম বন্দরের ভাষায় ছিঁচকে চুরি। জেলেদের ছোট ছোট নৌকা দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের রশি কিংবা অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার তুচ্ছ ঘটনায় সুনামহানি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় এমন তিনটি ঘটনায় শিপিং খাতে যথেষ্ট আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মনোনীত ওয়াচম্যান নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চুরির ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে চায় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কম্বাইটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রোবারি এগেইনস্ট শিপ ইন এশিয়া (রিক্যাপ)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এশিয়ার বিভিন্ন  নৌ-অঞ্চলে ১১৩টি চুরি বা দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জলসীমায় তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে, ইন্দোনেশিয়ায় ৬টি, ভারতে ৪টি, ভিয়েতনামে ২টি ও সাউথ চায়নায় ২টি এবং সিঙ্গাপুরের আওতাধীন মালাক্কা প্রণালিতে ৯৬টি জাহাজে চুরি বা দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। আর এই রিপোর্টের পরই শিপিং খাতে ঝড় বইছে। সম্প্রতি নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে সব বাণিজ্যিক জাহাজে ওয়াচম্যান (জাহাজে পাহারা দেওয়ার জন্য চার থেকে ছয় জনের একটি টিম) নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর এই ওয়াচম্যান নিয়ে শিপিং এজেন্টগুলোর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিরোধ চলছে। এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মো. শফিউল বারীর সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় তিনটি জাহাজে চুরির ঘটনা ঘটেছে। এতে বহির্বিশে^ চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষুন্ন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বন্দরের সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে এবং জলসীমায় কোনো ধরনের চুরি বা ডাকাতির ঘটনা ঘটতে দেওয়া যাবে না। আমরা দেশের সমুদ্র বাণিজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে চুরি ডাকাতির হার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, আমাদের পরিসংখ্যান বলছে যেসব জাহাজে ওয়াচম্যান ছিল সে সব জাহাজে চুরি ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি।

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘ওয়াচম্যান প্রতিটি জাহাজের নিরাপত্তার দেখভাল করে। আর এসব ওয়াচম্যান বন্দর কর্তৃপক্ষের মনোনীত। তাই বন্দর সীমায় যেসব ছিঁচকে চুরির ঘটনা ঘটছে সেগুলো ওয়াচম্যান, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর মাধ্যমে সহজেই শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।’

এদিকে জাহাজে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা ঘটলে বিশ্ব নৌবাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষুন্ন হবে বলে জানান বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো বন্দরের সীমায় চুরি বা ডাকাতির ঘটনা ঘটে তখন জাহাজ মালিকরা সে সব বন্দরে জাহাজ পাঠাতে চায় না। আর পাঠালেও বেশি ভাড়া ধার্য করে। তাই দেশের আমদানি-রপ্তানির বাণিজ্যের স্বার্থে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম রক্ষার্থে এমন চুরির ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।’

মালাক্কা প্রণালিতে চুরি-ডাকাতির সংখ্যা এত বেশি কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মালাক্কা প্রণালিটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্র বাণিজ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। এই পথের উভয় পাশে অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া এই তিনটি দেশ সম্মিলিতভাবে এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু দস্যুরা দ্রুত জাহাজে উঠে চুরি বা ডাকাতি করে পালিয়ে যায়।

২০১০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে ২১টি, ২০১১ সালে ১৪টি ও ২০১২ সালে ১২টি চুরির ঘটনার পর চট্টগ্রাম বন্দরকে একপ্রকার কালো তালিকাভুক্ত করেছিল রিক্যাপ। পরবর্তী বছরগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেই তালিকা তুলে নেওয়া হয়। এমনকি ২০১৯ সালের পর চুরির অভিযোগ একেবারেই শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। অবশ্য ২০২৪ সালে ১০টি, ২০২৩ সালে ১টি, ২০২২ সালে ৪টি চুরির ঘটনা ঘটেছিল। চট্টগ্রাম বন্দরে প্রকৃতপক্ষে চুরি বা দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘মূলত জেলেদের নৌকাগুলো থেকে কিছু ছিঁচকে চোর এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে। এগুলো যাতে না ঘটে সে জন্যই আমরা সব বাণিজ্যিক জাহাজে ওয়াচম্যান নিয়োগ করতে বলেছি। আর আমাদের ওয়াচম্যানগুলো কোস্টগার্ড থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এছাড়া কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টিম টহলে রয়েছে। আমরা বন্দরের স্বার্থে এমন দুর্ঘটনাগুলো শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চাই।’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে ৩০টি শিপিং কোম্পানির গড়ে ১২৬টি জাহাজ চলাচল করে। এসব জাহাজ ঘুরেফিরে বন্দরে আসা-যাওয়া করে। এসব জাহাজ দিয়েই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ হ্যান্ডলিং করে। এই বন্দর দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার কনটেইনার এবং ১৩ কোটি মেট্রিক টন কার্গো পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে রয়েড লিস্টে বিশে^র শীর্ষ ১০০ বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ৭৭তম অবস্থানে রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত