ভালো-মন্দের আপেক্ষিকতায় দেশ এগোচ্ছে নির্বাচনের দিকে। ইলেকশন ট্রেনটি ঘড়ির কাঁটা মেপে না ছুটলেও, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে স্টেশনে পৌঁছা নিয়ে সংশয় অনেকটা কেটে গেছে। এরপরও ‘নির্বাচন এলে হবে তো’ এমন প্রশ্ন পিছু ছাড়ছে না। প্রশ্নটি অস্বাভাবিকও নয়। অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের জায়গা টলমলে হলে যা হয়। টানা তিন মেয়াদে নির্বাচনের নামে, সার্কাস দেখেছে মানুষ। এর আগের টামের্, ২০০৮ সালে হয়েছে আরেক কিসিমের মশকারা। কদিন আগের ডাকসু-জাকসু নির্বাচন প্রশ্নে এত বেশি ‘যদি-কিন্তু-তবে’ যোগ করেছে, তা মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সেই ল্যাঠার মধ্যে, নেপাল একটা টোকা দিয়েছে আমাদের রাজনীতি এবং দ্রুত সম্ভাব্য নির্বাচনে। নেপালে সুশীলা কার্কির ইন্টেরিম সরকার শপথ নিয়েই, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচনমুখীদের কাছে মনে হয়েছে, এমনই তো চাই। বাংলাদেশেও দরকার ছিল এমন ঘোষণা। নেপালে বিপ্লবীরা সরকারে ঢোকেননি। কলকারখানা বন্ধ হয়নি। নানান কমিশন গঠন, সংস্কার, ঐকমত্যের কথা নেই। ডাকসু-জাকসুর মতো ঘটনাও নেই। এ তো আরও চমৎকার। চমৎকারের ওপর চমৎকার। এই চমৎকারিত্বের সঙ্গে সেখানে জেন-জি বিক্ষোভের সময়ের সিংহ দরবার, পার্লামেন্ট ভবন, সুপ্রিম কোর্টে চালানো সহিংসতার তদন্ত করবে বলে জানিয়েছে তার সরকার। এটি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ কারও কারও কাছে বেশ চমৎকার। ভালোর চেয়েও ভালো। কোনটা কার কাছে কেন ভালো? কে জানে, না বোঝে? ভালো লাগার এ আপেক্ষিকতার মধ্যে আরও ঘটনা আছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সুশীলা বলেছেন, ‘আমি এই দায়িত্ব নিতে চাইনি। রাজপথে নামা বিক্ষোভকারীদের আহ্বানে আমি সাড়া না দিয়ে পারিনি। তাদের (জেন-জি প্রজন্মের) চিন্তাধারার জায়গা থেকে আমাদের কাজ করতে হবে। এই প্রজন্ম দুর্নীতির অবসান, সুশাসন ও অর্থনৈতিক সমতা চায়। মাত্র ২৭ ঘণ্টার বিক্ষোভে আমি আগে কখনো এমন পরিবর্তন দেখিনি।
এই তরুণ প্রজন্মের দাবিগুলো পূরণে, আমাদের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে এগোতে হবে। দুর্নীতি দমনের জন্য বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে চলার অঙ্গীকারও করেছেন সুশীলা কার্কি। সুশীলার বক্তব্যের এ অংশটুকু আবার সবার কাছে ভালো লাগেনি। সুবিধা মতো, ভালো লাগার এ প্রবণতা নতুন নয়। মাত্রাগতভাবে বাংলাদেশের মতো না হলেও নেপালে দুর্নীতি, বেকারত্ব, বৈষম্য ও রাজনীতিবিদদের স্বজনপ্রীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। তবে, সেখানে গুম-খুন, আয়না ঘর, বিদেশে অর্থ পাচার, বেগমপাড়ায় বাড়ি কেনা, দিনের ভোট রাতে, বিনা ভোটে ১৫৪ জনকে এমপি বানিয়ে দেওয়া, আমি-ডামি-স্বামী-মামীদের দিয়ে সংসদীয় তামাশা হয়নি। আন্দোলনকারীদের নেশাখোর, রাজাকারের নাতিপুতি সম্বোধনে সমানে গুলি করে হত্যার চেতনা কায়েম হয়নি। আইন-আদালত-প্রশাসনকে বাংলাদেশের মতো দলীয়করণ করা হয়নি। তাই সুশীলার ইন্টেরিমের কাজের ভলিউম ড. ইউনূসের চেয়ে ছোট। সংগত কারণেই সেখানে সংস্কার, বিচার, ঐকমত্য এখানকার মতো মোটাদাগের নয়। নির্বাচনই এখন সেখানে মুখ্য। বাংলাদেশেও নির্বাচন মুখ্য এবং জরুরি। তবে, তা সংস্কার-বিচারকে বাদ দিয়ে নয়। সেই প্রস্তুতি জোরেশোরেই চলছে। মাঝেমধ্যে যে ফ্যাকড়া বাধছে, সেটাও নির্বাচন করার জন্যই। নির্বাচন না করার জন্য নয়। সবারই চাওয়া, বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া ভোটের স্বাদ ফিরিয়ে আনা। এই চাওয়া-পাওয়ার পথে পরিমাণে কথা বেশি হয়ে যাচ্ছে জুলাই সনদ নিয়ে। ঐকমত্য কমিশন এখনো একটি সাব্যস্তে আসতে না পারায়, অতিকথনে ক্যাচাল বাড়ছে। কথায় কথায় আবার আন্দোলনের হুমকি-ধমকিও চলে আসছে। অবিলম্বে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ চার দফা দাবিতে মাঠ গরম করছে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল। এটিও প্রকারান্তরে নির্বাচনী ডামাডোল। নিজেদের অস্তিত্ব-হিম্মত জানান দেওয়া। দর বাড়ানো। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান, জুলাই সনদের ভিত্তিতে নির্বাচনের দাবি হারিয়ে যাবে বড় দল বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়ার পর। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন-সহ চার দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপিসহ কয়েক জোড়া রাজনৈতিক দলের এ অবস্থান মূলত চাপ বাড়ানো এবং নির্বাচনী বোঝাপড়ার রিহার্সাল। তাদের অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে (পিআর) জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরি করা এবং ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।
কয়েক দফা বৈঠকের পর জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি, বাস্তবায়নসহ এর ভিত্তিতে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ চার দফা দাবিতে দলগুলো যুগপৎ কর্মসূচি শুরুর বিষয়ে একমত হয়েছে। মানে নির্বাচনী ট্রেনের সহযাত্রী হয়েছেন তারা। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ছাড়া চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ ও আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস, নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন গণ অধিকার পরিষদ, মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও সরওয়ার কামাল আজিজীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিও রয়েছে নির্বাচনের এ সহযাত্রায়। তাদের কেউই নির্বাচনের বাইরে নয়। যে মান বা পর্যায়েরই হোক, সমাধান নির্বাচন তথা নির্বাচিত গণপ্রতিধিদের মাধ্যমেই আসবে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাব, প্রণয়ন ও তৈরির ক্ষেত্রে নাগরিকদের মত প্রয়োগের মাধ্যম নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। দেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় দেশ একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। যা একটি ধারাবাহিকতা। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে কখনোই সত্যিকারের গণতান্ত্রিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সেটারও সর্বনাশ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, বিরোধীদের দমন করেছে। এটা অবসানের আকাক্সক্ষা কাম্য বলেই, নানা টেকসই ব্যবস্থা নিয়ে কথা হচ্ছে। হওয়াই উচিত।
তারুণ্য সেখানে অগ্রগামী। যুব নেতৃত্বাধীন নানা উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে। কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিরক্ত। এর জেরেই চব্বিশের বিপ্লব এবং বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জাতীয় ঐক্যের এত প্রাসঙ্গিকতা। কাক্সিক্ষত ঐকমত্য না এলেও, জুলাই সনদ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে একটা বোঝাপড়া আসতে শুরু করেছে। তারাও বলছেন এভাবে আর নয়, চাচ্ছেন সময়োপযোগী একটা বন্দোবস্ত। গোলমাল চলছে, সেটি কার্যকর বা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। যে যার পন্থার প্রস্তাব দিচ্ছেন। সনদ বাস্তবায়নে অস্থায়ী সাংবিধানিক আদেশ বা গণভোট চায় জামায়াত। গণপরিষদ নির্বাচনের কথা আবারও বলেছে এনসিপি । সনদ বাস্তবায়ন সংসদকে দিতে চায় বিএনপি, প্রয়োজনে আদালতের মতামত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। যেন ভবিষ্যতে এ নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। প্রধান উপদেষ্টা এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ আন্তরিক। আরোপ নয়, বোঝাপড়া তথা ঐকমত্যের মাধ্যমে ফয়সালা চান তিনি। তার আশা, এ বোঝাপড়ার পর ফেব্রুয়ারিতে হবে একটি ‘মহোৎসবের নির্বাচন’। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এ সংক্রান্ত কমিশনটির প্রধান। তার সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ এখন নির্বাচন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতির সত্যিকারের নবজন্ম হবে এমন প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে রবিবার ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন ড. ইউনূস। সংলাপের শুরুতে তিনি বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমঝোতায় আসতেই হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের কাছে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এই একমাত্র সুযোগ এবং আমাদের এটা গ্রহণ করতেই হবে। এটা থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো উপায় নেই। সমঝোতা বলেন, ঐক্য বলেন, আর যাই বলেন যখন নির্বাচনে যাব, তখন একমত হয়ে সবাই যাব। এর মধ্যে কোনো দ্বিমত আমরা রাখব না।’ আরও যোগ করলেন: ‘স্বৈরাচার যাতে না আসতে পারে, সে জন্যই সংস্কার প্রয়োজন। ভবিষ্যতে স্বৈরাচার আসার সব পথ আমরা এই সংস্কারের মাধ্যমে বন্ধ করে দিতে চাই। প্রথমে আমি নিশ্চিত ছিলাম না, এ প্রক্রিয়া থেকে কী পাওয়া যাবে। ভাবছিলাম কথা শুরুর পর সেটি কলাপস করে যাবে, কিন্তু দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর আমি অবগত হয়েছি, সিদ্ধান্ত নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি চলছে।’ ঐকমত্য কমিশনের কাজ বিশ্বব্যাপী নজির হয়ে থাকবে এ উচ্চাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘এটি যেন খুঁতওয়ালা নজির না হয়, এটা আমার আবেদন। এমন নজির সারা বিশ্ব দেখবে এবং অনুসরণ করার চেষ্টা করবে। আপনারা মূল কাজটি সম্পন্ন করেছেন। এখন সামান্য পথ বাকি। সব কিছু নির্ভর করছে শেষ অংশটুকুর ওপর।’ একজন প্রধান উপদেষ্টা, তাও আবার একজন নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের পক্ষে এর চেয়ে বেশি আর কী, কত আবেদন-নিবেদন থাকতে পারে। তিনি অবশ্যই আরও আগে উপলব্ধি করছেন, রাষ্ট্র চালানো রাজনীতিকদের কাজ। তার এক্সপার্টিজম অন্য জায়গায়। রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের মতো চালানোর একটা ব্যবস্থা তিনি করে দিয়ে যাবেন, এ অভিপ্রায় তার স্পষ্ট। যার মনের গহিনে যে কথাই থাক রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশ আর অবকাঠামোগত দুর্বলতার ঘূর্ণাবর্ত থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ এখন একটি সুন্দর নির্বাচন। রাজনীতির পাশাপাশি দেশের বিজনেস কমিউনিটির অপেক্ষাও সেদিকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আস্থাহীনতা আর অনিশ্চয়তার এই দীর্ঘ ছায়া দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনীতি ও হাল বাস্তবতা বোঝা, যে কোনো মানুষেরই বোধগম্য। ব্যবসা না জমলে, নতুন বিনিয়োগ আসবে না। উৎপাদন বাড়বে না। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না। তার জন্য দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সেটা গত এক বছরে নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে। আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রথম পাঠ বা দাওয়াই হচ্ছে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
লেখক" সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
