বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ হলো দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। এ দুটি সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয় বরং কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের অর্থনীতি তখনই টেকসই হয়, যখন সেখানে প্রতিটি মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রেখে, মানবিক জীবনযাপনের সুযোগ পায়। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র মানে হলো, এমন একটি কাঠামো যেখানে সবার সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা একটি গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ না থেকে, জনগণের হাতে পৌঁছায়। অর্থনৈতিক সুযোগ শুধু ধনী ও শক্তিশালীদের জন্য নয় বরং শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী, নারী, যুবক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি সবার নাগালে আসে এবং প্রত্যেকে তার জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ পায়। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা কেন অপরিহার্য, তা ইতিহাসও প্রমাণ করেছে। বৈষম্যমূলক বা একচেটিয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা দারিদ্র্য ও বেকারত্ব আরও বাড়ায়। যখন সম্পদ ও ক্ষমতা কেবল একটি গোষ্ঠীর হাতে থাকে, তখন সমাজের বৃহৎ অংশ বঞ্চিত হয়। এই বঞ্চনা অশান্তি, অপরাধ ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। বিপরীতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র মানুষকে কাজে, শিক্ষায় ও উৎপাদনে যুক্ত করে সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনই একমাত্র টেকসই সমাধান।
আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্তির অভাব। জাতিসংঘের তথ্য বলছে আজও পৃথিবীতে প্রায় ১১০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যে দিন কাটাচ্ছে। তাদের অর্ধেকই সংঘাতকবলিত অঞ্চলে বসবাস করে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই চিত্র আরও ভয়াবহ। শুধু ভারতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে প্রায় ২৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ, পাকিস্তানে ৯ কোটি ৩০ লাখ এবং বাংলাদেশে ৪ কোটির বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশু। বাংলাদেশে দারিদ্র্যের প্রধান চালিকাশক্তি হলো, মানুষের জীবনযাত্রার মানের অবনতি (৪৫.১%), শিক্ষা (৩৭.৬%) ও স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা (১৭.৩%)। অর্থাৎ ন্যূনতম আবাসন, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন, পুষ্টি ও শিক্ষার অভাবই আমাদের দারিদ্র্যের মূল কারণ। এ জন্য এ কথা অনস্বীকার্য যে, দেশে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য নিরসনে একমাত্র কার্যকরব্যবস্থা হতে পারে একটি শক্তিশালী মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি। বিশে^র অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব। দরকার বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ। ভারতের ‘মঙ্গল দামোডর’ প্রকল্প, ভিয়েতনামের গ্রামীণ কৃষি ও উৎপাদন সমন্বয়, কিংবা ব্রাজিলের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সব ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, সরাসরি অর্থনৈতিক সহায়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ন্যায়সংগত বণ্টন, কৃষক ও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করাই সাফল্যের চাবিকাঠি। এই মডেলগুলো বাংলাদেশেও প্রযোজ্য হতে পারে। বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখায় একটি সুস্পষ্ট বার্তা আছে শ্রমিক, কৃষক ও যুবসমাজকে শক্তিশালী করে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়পরায়ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। তারেক রহমান অঙ্গীকার করেছেন, বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বেকার ভাতা, ফারমার্স কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও নানামুখী বাস্তব কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য, বেকারত্ব নিরসন এবং শ্রমিক-কৃষক অধিকার নিশ্চিত করবেন। যা হবে বাস্তব ও টেকসই সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো গঠনের রূপরেখা। তিনি স্পষ্ট বলেছেন ‘বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু নয়।’ অর্থাৎ কেউ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে মারা না যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষিত যুবসমাজের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। ‘বেকার ভাতা’ চালু করে শিক্ষিত যুবকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে যুবসমাজকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখা হবে। যা যুবসমাজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও উদ্যোগী মনোভাব গড়ে তুলবে। কৃষকদের জন্য ফারমার্স কার্ড চালু করা হবে। এতে কৃষকের নাম, জমির পরিমাণ, দাগ নম্বরসহ তথ্য থাকবে। ঋণ ও ফসলের খরচ সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছাবে। প্রতিবছর একজন কৃষককে একটি ফসলের জন্য পূর্ণ সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রাথমিকভাবে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, মৌসুমি বেকারত্ব কমবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্জীবিত হবে। বাংলাদেশের শ্রমিক ও কৃষক জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ ১৫-৬৪ বছরের মধ্যে কর্মক্ষম। প্রান্তিক কৃষক ঋণ, বাজার ও প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত। গার্মেন্টস শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। চা-শ্রমিক ও নির্মাণ শ্রমিকরা এখনো দুর্বল ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করছেন। বাংলাদেশের পোশাক খাত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক। এতে ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন, যেখানে ৮০ শতাংশ নারী। তবে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। ৩১ দফা রূপরেখা অনুযায়ী, শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। গার্মেন্টসসহ উৎপাদন খাতের শ্রমিকদের চিকিৎসা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, আবাসন ও শিশুশিক্ষার সুবিধা দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন অনুযায়ী শ্রম আইন সংস্কার করে সংগঠন, ধর্মঘট ও যৌথ দরকষাকষির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের স্বীকৃতি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা কাঠামো গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্ঘটনাজনিত আহত শ্রমিকদের জন্য জাতীয় শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন করা হবে। চা-শিল্পও দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাত। বর্তমানে ১৬৭ চা-বাগান এবং প্রায় ৭ লাখ শ্রমিক। তাদের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকার বেশি নয়। বসবাসের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেই, স্বাস্থ্যসেবা সীমিত। নারী শ্রমিকদের নির্যাতন, শিক্ষিত যুবকের বেকারত্ব এবং অসংগঠিত পরিবেশ চা খাতকে সংকটে ফেলেছে। শুধু চা-শ্রমিক নয়, সব শ্রেণি-পেশার শ্রমিকদের জন্য ৩১ দফার রূপরেখা এই চিত্র পরিবর্তনে সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। দারিদ্র্য মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু, যা শুধু পেটের ক্ষুধা নয় মানুষে মানুষে বৈষম্য, বিভেদ, শোষণ, সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে ও অনাচারের জন্ম দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অনাবৃষ্টি এসব দুর্যোগ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে। গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ জমি হারিয়ে শহরমুখী হয়, বেকারত্ব বাড়ে, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংকট তীব্র হয়। পরিসংখ্যান বলছে দেশের দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে। শহরাঞ্চলেও একই প্রবণতা। ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে তা বেড়ে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। জীবিকা হারানো, জলবায়ু বিপর্যয়, যুদ্ধ ও সংঘাতের অভিঘাত, নাগরিক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সংকোচন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় ভয়াবহ বৈষম্য। সব মিলিয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আরও প্রান্তিক দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্প, প্রযুক্তি ও কৃষি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। উদ্ভাবনী স্টার্ট-আপ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং নতুন প্রযুক্তি খাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দেশকে তার মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় ছোট ও কটেজ শিল্প স্থাপন করা হলে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া সম্ভব। এছাড়া সরকারি শিল্পকারখানা বন্ধ না রেখে সচল রাখা হলে দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান দুটোই নিশ্চিত করবে। বেকার যুবকদের জন্য চাহিদা-উপযুক্ত দক্ষতা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কোর্স এবং ইন্টার্নশিপ ব্যবস্থা করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর জোর, স্বাস্থ্যসেবা ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের ওপর মনোযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি। বেকার যুবকদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ এবং উদ্যোক্তা সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাঁস-মুরগি পালন, গবাদি পশুপালন, মাছ চাষ, নার্সারি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র উদ্যোগে সহায়তা প্রদান করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। দক্ষ ও প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। গ্রামীণ ও শহুরে যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে স্বনির্ভর করতে মূলধন ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। নারীর ক্ষমতায়ন ও তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং অন্যান্য স্বাধীন পেশাজীবীদের জন্য সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করা, কর ছাড় এবং অন্যান্য নীতি-সহায়তা প্রদান করা। কুটির শিল্প, হস্তশিল্প ও স্থানীয় শিল্পের বৃদ্ধি করা। মার্কেটিং ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা। নতুন উদ্ভাবনী প্রকল্প এবং গবেষণা উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য খাতে নতুন চাকরি সৃষ্টি করা, কমিউনিটি হেলথ ও নার্সদের জন্য প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ নিশ্চিত করা। বেকারত্ব কোনো অমীমাংসিত সমস্যা নয় সঠিক পরিকল্পনা, সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পায়ন নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, সরকারের পাশাপাশি সমাজ ও পরিবারকেও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে যাতে যুব সমাজ কেবল চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে, বরং উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করে। ৩১ দফা রূপরেখা স্পষ্ট শ্রমিক, কৃষক ও যুবসমাজকে শক্তিশালী করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়পরায়ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন সম্ভব। বেকার ভাতা, ফারমার্স কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, শ্রমিক ও কৃষক অধিকার নিশ্চিতকরণ বাস্তব ও টেকসই সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো নির্মিত হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসন হবে, খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং দেশের যুবসমাজ ও শ্রমিক শক্তি অর্থনীতির কার্যকর অংশ হবে যা যুগান্তকারী, বাস্তবসম্মত ও মানবিক পদক্ষেপ।
লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক
