শিশুর ধর্মীয় শিক্ষায় অবহেলা নয়

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:২৯ এএম

শিশুরা জন্মগ্রহণ করে নির্মল-নিষ্পাপ স্বভাব নিয়ে। এই নিষ্পাপ সত্তাকে কোন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে, তা নির্ভর করে বাবা-মা ও পরিবারের ওপর। শিশুর প্রথম পাঠশালা তার পরিবার। বাবা-মায়ের আচরণ, কথাবার্তা, চলাফেরা, এমনকি তাদের নীরবতা পর্যন্ত সন্তানের অন্তরে গভীর ছাপ ফেলে। সে যেমন পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তার মানস গঠন ও চরিত্রও তেমন হয়। তাই ইসলাম শিশুদের শৈশবকাল থেকেই সঠিক পথে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। কারণ এ সময়ই তার অন্তর কোমল ও গ্রহণক্ষম থাকে। যা শেখানো হবে, সেটিই তার চিন্তাধারার ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে। আমরা জানি, শিক্ষা মানুষের উন্নতির প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু শুধু জাগতিক শিক্ষা দিয়েই একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ে তোলা যায় না। জ্ঞানের আলো যেমন প্রগতি ও উন্নতির পথ দেখায়, তেমনি ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে স্রষ্টার সঙ্গে পরিচিত করায়, তার ভেতরে নৈতিকতার মশাল জ¦ালায়। নৈতিকতা ছাড়া মানুষ জ্ঞান অর্জন করলেও সেই জ্ঞান অন্ধকারের দিশারি হয়ে দাঁড়ায়। আজকের বিশে^ আমরা প্রায়ই দেখি, উন্নত প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও শিল্পের বিস্ময়কর অগ্রগতি সত্ত্বেও মানবজাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। কারণ এই অগ্রগতিকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো নৈতিক শক্তি অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ফলে মানুষ ধন-সম্পদ অর্জনের উপায় বের করেছে, কিন্তু ন্যায়বিচার বিসর্জন দিয়ে তা লুণ্ঠনের হাতিয়ার বানিয়েছে। এর মূল কারণ হলো, নৈতিক শিক্ষার শূন্যতা, ধর্মীয় শিক্ষার অবহেলা।

শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। যদি তাদের আদর্শিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে তারা জাতিকে আলোকিত করবে। কিন্তু যদি শৈশবেই তাদের অন্তরে সৎ-অসৎ, হালাল-হারামের পার্থক্য সৃষ্টি না হয়, তবে বড় হয়ে তারা বিভ্রান্তির শিকার হবে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রত্যেক সন্তান ফিতরাতের (আল্লাহর একত্বকে স্বীকার করার সহজাত ক্ষমতা) ওপর জন্ম নেয়, পরে তার মা-বাবাই তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়। অর্থাৎ সন্তান কোন পথে চলবে, তা নির্ধারণ করে তার পরিবার। আজকের সমাজে অনেক বাবা-মায়ের প্রবণতা হলো সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বড় কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী বানানোর স্বপ্ন দেখা। এ জন্য তারা ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে ব্যস্ত রাখেন স্কুল, কোচিং, টিউশন আর নানা ধরনের প্রতিযোগিতায়। কিন্তু তারা ভুলে যান, শুধু বড় চাকরি নয়, সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো আখেরাতের প্রস্তুতি। তাই এসবের পাশাপাশি শিশুদের ধর্মের মৌলিক জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক। সন্তান যদি একজন প্রকৃত মুসলমান হিসেবে না গড়ে ওঠে, তবে সে যতই বড় ডিগ্রি অর্জন করুক না কেন, সমাজে শান্তি বয়ে আনতে পারবে না। অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, ইমান ও নৈতিকতা ছাড়া জ্ঞান অসম্পূর্ণ।

বাবা-মায়ের দায়িত্ব শুধু সন্তানকে অন্ন, বস্ত্র, আবাসের জোগান দেওয়া নয়, বরং তার আত্মার খোরাকের ব্যবস্থাও করা। রুহের খোরাক ছাড়া মানুষ কখনো পূর্ণ হতে পারে না। কোরআন তেলাওয়াত শেখানো, নামাজ-রোজার অভ্যাস করানো, হালাল-হারাম সম্পর্কে সচেতন করা, এগুলো হলো সেই খোরাক, যা শিশুর অন্তরকে আলোকিত করে। এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে একজন সত্যিকারের মানুষ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজে ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই সমাজেই নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার স্ফুরণ ঘটেছে। আজ আমরা প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বাস করছি। শিশুদের হাতে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও নানা বিনোদনের সুযোগ। এই বাস্তবতায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে। কারণ ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া শিশু এই ভোগবাদী দুনিয়ায় নিজেকে সামলে রাখতে পারবে না। তাকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য শেখাতে হবে, তাকে বোঝাতে হবে কেন নামাজ পড়া জরুরি, কেন মিথ্যা বলা হারাম, কেন মানুষের হক নষ্ট করা মহাপাপ। এই শিক্ষা তাকে শুধু পারলৌকিক মুক্তিই দেবে না, বরং দুনিয়ার জীবনেও সফল করবে।

অনেক সময় দেখা যায়, আমাদের সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা খুবই অবহেলিত। কেউ কেউ মনে করেন, মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা মানেই ধর্মীয় শিক্ষা আর স্কুল-কলেজে পড়াশোনা মানেই আধুনিক শিক্ষা। আসলে এ দুটি একে অপরের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ করতে হলে উভয় শিক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন। শিশু যখন ছোট থাকে, তখন তার অন্তরে যদি আল্লাহর ভয়, রাসুলের ভালোবাসা এবং কোরআনের প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়ে দেওয়া যায়, তবে সে যত বড়ই হোক না কেন, বিভ্রান্ত হবে না। সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে শায়খ আহমদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক, এটা বহুকাল ধরে গণমানুষের প্রাণের দাবি ছিল। সেই দাবি আজও বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ প্রাথমিকে গানের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এ দেশের প্রায় সব অভিভাবক সন্তানের জন্য প্রাইভেট ধর্মীয় শিক্ষক রাখেন কিংবা সন্তানকে মক্তবে পাঠান। সরকার যদি স্কুলে বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিত, তাহলে অভিভাবকদের এই বাড়তি খরচ ও ঝামেলা পোহাতে হতো না। শিক্ষার্থীদেরও সময় বেঁচে যেত। প্রাথমিক শিক্ষার পেছনে রাষ্ট্র প্রতি মাসে শত শত নয়, বরং হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। অথচ শিক্ষার মান দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। সরকারের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান, গণ-আকাক্সক্ষা উপেক্ষা করে বাইরে থেকে আমদানি করা কালচার চাপিয়ে দেওয়ার চিরাচরিত পথ পরিহার করুন। দেশের মানুষ এসবের পরিবর্তন চায়।’

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত