শিক্ষক সংকটে ‘শিক্ষাজট’

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:১২ এএম

টাল অবস্থা বিরাজ করছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে। অল্পসংখ্যক স্থায়ী শিক্ষক ও অন্য বিভাগের শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে চলছে অন্তত ১৫ বিভাগের কার্যক্রম। এতে বিভাগগুলোতে সেশনজটের সৃষ্টি হয়েছে। কিছু বিভাগ সেশনজট কাটিয়ে উঠলেও মানসম্মত পাঠদান পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা পাশাপাশি শিক্ষকদেরও অতিরিক্ত কোর্স পড়ানোর চাপ সামলাতে হচ্ছে। ফলে এ সব ভোগান্তি নিরসনে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৮০ জন শিক্ষকের প্রয়োজন থাকলেও মাত্র ৪০৬ জন শিক্ষক আছেন বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি)। যা অ্যাক্রিডিটেশনের শর্তের চেয়ে অনেক কম।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে, মোট ৩৬টি বিভাগের মধ্যে ১৫টি বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট রয়েছে। এর মধ্যে ফাইন আর্টস বিভাগে ৫ জন, সমাজকল্যাণ বিভাগে ৩ জন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ৫ জন, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে ৩ জন, ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগে ৪ জন, ল অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ৪ জন, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ৪ জন, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ৫ জন, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগে ২ জন, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৪ জন, ফার্মেসি বিভাগে ৬ জন, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগে ২ জন, মার্কেটিং বিভাগে ৫ জন এবং জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগে ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন।

প্রতিটি বিভাগে ৬-৭টি ব্যাচ অধ্যয়নরত থাকায় বিভাগীয় কার্যক্রম সচল রাখতে বাধ্য হয়ে অন্য বিভাগের শিক্ষকদের ধার নিতে হচ্ছে। বারবার শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানালেও তা পূরণ হচ্ছে না। এদিকে বিভাগীয় সভাপতিদের অভিযোগ, প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এ সংকট নিরসন হচ্ছে না। এ নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন করে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ৬টি ব্যাচের ১৮টি ডিসিপ্লিনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম মাত্র ৫ জন শিক্ষক দিয়ে চালানো হচ্ছে। এ ছাড়াও সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের সাতটি বিভাগে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শিক্ষকরা। তাদের অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক স্বচ্ছভাবে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি।

রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষক সংকট নিরসনে ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, জীববিজ্ঞান, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ২১টি বিভাগে মোট ৫৯টি শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগে প্রার্থীরা আবেদনও করেন। তবে এসব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে ইউজিসির অর্থছাড়ের পূর্বানুমতি নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে। পরে ইউজিসি শিক্ষক সংকট বিবেচনায় মাত্র ছয়টি পদে অর্থছাড় অনুমোদন দেয়। এ ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম মাল্টিমিডিয়া বিভাগের শিক্ষার্থী শান্ত শিশির বলেন, ‘আমাদের বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট রয়েছে। মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে ৪-৫টি ব্যাচের ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে সাংবাদিকতা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্য বিভাগের শিক্ষকরা সহযোগিতা করলেও বিষয়টি প্র্যাকটিক্যালভিত্তিক হওয়ায় কাক্সিক্ষত শিক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া কর্মমুখী এ বিভাগে নেই কোনো ল্যাব, ক্যামেরা কিংবা নিউজরুম-সংশ্লিষ্ট ক্লাসরুম। তাই দ্রুত নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) পরিচালক অধ্যাপক ড. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘ইবির বিভিন্ন বিভাগে মাত্র দুই-তিনজন শিক্ষক অনেকগুলো কোর্স পড়াচ্ছেন। এটি ইউজিসির ক্লাস লোড পলিসির পরিপন্থী। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগের জন্য অ্যাক্রিডিটেশনের ন্যূনতম শর্ত পূরণ করতে যেখানে ১ হাজার ৮০ জন শিক্ষক প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে শিক্ষক আছেন মাত্র ৪০৬ জন।’

ইউজিসির অর্থছাড় প্রসঙ্গে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক বলেন, ‘অর্থছাড় অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় ৫৯টি পদ অনুমোদন পায়নি। তবে বর্তমানে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা কম থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতুন নিয়োগের অনুমোদন পেতে কাজ করছে। শিগগিরই এ বিষয়ে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ইউজিসি থেকে অনুমোদন পাওয়া যাবে ভেবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে পরে শুধু ৬টি পদের নিয়োগের অর্থছাড় অনুমোদন মেলে। শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক কম থাকায় অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ জরুরি। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইউজিসির অর্থছাড় অনুমোদন পেতে নিয়মিত কাজ করছে।’

ইবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এয়াকুব আলী বলেন, ‘নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার আগে উপাচার্য স্যার আমার সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করেননি। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত