ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। একসময় এর নাম ছিল পিতলগঞ্জ। ব্রিটিশ আমলে নীলকুঠিরদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে খেয়ামাঝি ঈশ্বরপাটনী সাহসী ভূমিকা রেখে শহীদ হন। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে পরবর্তীতে নামের সঙ্গে ‘গঞ্জ’ যুক্ত করে এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয় ঈশ্বরগঞ্জ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর পাক-হানাদারমুক্ত হয় এ উপজেলা। পরে ১৯৮৩ সালের ১৫ নভেম্বর এটিকে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কৃষি উৎপাদনে সমৃদ্ধ চরাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য।
ঈশ্বরগঞ্জের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে জড়িয়ে আছে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের স্মৃতি। ব্রহ্মপুত্র ও কাঁচামাটিয়া নদী বয়ে গেছে এর বুক চিরে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের শেষ সময়ে এসেছিলেন এখানকার আঠারবাড়ী জমিদারবাড়িতে। ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে তিনি আতিথ্য গ্রহণ করেন। স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে, কবি এখানেই পুকুরঘাটে বসে লিখেছিলেন তাঁর অমর সৃষ্টি—‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে’।
ঈশ্বরগঞ্জেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন খ্যাতিমান কবি আবদুল হাই মাশরেকী। ১৯০৯ সালের ১ এপ্রিল পৌর এলাকার কাঁকনহাটি গ্রামে তাঁর জন্ম। ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে... মাঝি বাইয়া যাও রে... আমার কাঙ্খের কলসি...’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান ও কবিতার স্রষ্টা তিনি। দেশাত্মবোধক গান, পালাগান ও কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন এ অঞ্চলকে। ১৯৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর ৭৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদেরও স্মৃতিধন্য আঠারবাড়ী জমিদারবাড়ি। ২০০৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর চলচ্চিত্র ‘চন্দ্রকথা’র চিত্রায়ণ হয় এখানেই। ২০০৮ সালে তাঁর ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমায় দেখা যায় ঈশ্বরগঞ্জের সোহাগী রেলস্টেশনের দৃশ্য। যদিও তাঁর পৈতৃক ভিটা পাশের কেন্দুয়া উপজেলায়, তবু ঈশ্বরগঞ্জে তাঁর বিচরণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
ঐতিহ্যের ধারক এ উপজেলায় রয়েছে অনেক স্থাপনা ও নিদর্শন। আঠারবাড়ী জমিদারবাড়ি, উচাখিলার নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ, দেড়শ বছরের পুরোনো আট গম্বুজবিশিষ্ট ঈশ্বরগঞ্জ বড় জামে মসজিদ, হযরত শাহ সৈয়দ আব্দুল আজিজ বাগদাদীর মাজার, ভূইয়া বাজার মঠ এবং শিশুদের জন্য পৌর শিশু পার্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চরাঞ্চলে ভ্রমণকারীরা উপভোগ করেন ব্রহ্মপুত্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
ঈশ্বরগঞ্জ শিল্প-সংস্কৃতিতেও সমৃদ্ধ। এখানে ৫৩৪ ধরনের লোকশিল্প প্রচলিত। এর মধ্যে কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, লৌহশিল্প, মৃৎশিল্প, বাঁশ ও কাঠের কাজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলের জারিগান দেশজুড়ে খ্যাত, পাশাপাশি বাউল ও যাত্রাগানেরও প্রচলন রয়েছে। বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার ও কৌতুকাভিনেতা আশিষ কুমার লৌহও এই ঈশ্বরগঞ্জের সন্তান।
ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে ঈশ্বরগঞ্জ শুধু একটি উপজেলা নয়, বরং বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম ধারক।
দেশের বিবাদ বিদেশে মেটানোর সুযোগ
ডাকসুর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে