চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় অভিযান চালিয়ে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিদেশে অর্জিত সম্পদ ও ঋণসংক্রান্ত ২৩ বস্তা নথিপত্র জব্দ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত শনিবার রাত ৩টার দিকে উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের ফকিরা মসজিদ এলাকায় জাবেদের স্ত্রী রুকমিলা জামানের ব্যক্তিগত গাড়িচালকের বাড়িতে এ অভিযান চালানো হয়।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ওই গাড়িচালক ইলিয়াস তালুকদারের (৫০) বাড়িতে দুদফা অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে ওই সময় কোনো নথিপত্র উদ্ধার করতে পারেনি দুদক।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা এলাকা থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুই সহযোগী আব্দুল আজিজ ও উৎপল পালকে গ্রেপ্তার করে দুদক। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয় বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুই সহযোগী আব্দুল আজিজ ও উৎপল পালকে গ্রেপ্তার করে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে দুদক জানতে পারে জাবেদের স্ত্রী রুখমিলার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইলিয়াস তালুকদারের বাড়িতে কয়েক বস্তা নথিপত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর নথিপত্র উদ্ধারে গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই বাড়িতে অভিযান চালায় দুদক। কিন্তু এ সময় তার বাড়িতে কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি। তবে অভিযানের সময় আশপাশের কিছু সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করা হয়। অভিযানকালে গাড়িচালক ইলিয়াস তালুকদারকে না পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার স্ত্রী লাকী আকতার (৩০) ও প্রতিবেশী সাহাব উদ্দিন তালুকদারের স্ত্রী ঝুমা আকতারকে (২৬) আটক করে নিয়ে যায় দুদক। পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের কর্ণফুলী থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের জিম্মায় তাদের ছেড়ে দিতে নির্দেশনা দিয়ে চলে যান দুদক কর্মকর্তারা।
এদিকে জব্দ করা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে শনিবার রাতে আবারও অভিযান চালায় দুদক। প্রায় দুই ঘণ্টার অভিযানে ২৩ বস্তা বিভিন্ন নথিপত্র জব্দ করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মশিউর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে দুদকের একটি টিম ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) জাহাঙ্গীর আলমসহ পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
দুদক জানিয়েছে, বস্তাগুলোয় সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিদেশে সম্পদ অর্জনের নথি, বিল পরিশোধের তথ্য ও ভাড়া আদায়ের আলামত রয়েছে।
এ বিষয়ে দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মশিউর রহমান বলেন, ‘আমরা সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ঋণ সংক্রান্ত ও বিদেশে থাকা সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধানকালে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আব্দুল আজিজ ও উৎপল পালকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিই। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে আমরা ২৩ বস্তা নথিপত্র জব্দ করেছি। এগুলো আমাদের কার্যালয়ে নিয়ে প্রতিটি নথি যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত বলতে পারব।’
দুদক সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া উৎপাল পাল আরামিট গ্রুপের এজিএম হলেও দীর্ঘদিন ধরে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে সম্পদ ক্রয় ও দেখাাশোনার দায়িত্ব পালন করতেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার কাছ থেকে দুদকের জব্দ করা দুটি ল্যাপটপ ও দুটি মোবাইল ফোন ডিভাইস থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
দুদক আরও জানায়, উৎপল পাল দেশ থেকে দুবাই হয়ে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার প্রক্রিয়ার মূল হোতা। অন্যদিকে আব্দুল আজিজ আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেডের এজিএম হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সাবেক ভূমিমন্ত্রীর সম্পত্তি কেনাবেচা, ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন।
এর আগে গত ২৪ জুলাই দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মশিউর রহমান বাদী হয়ে সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদসহ ৩১ জনকে আসামি করে মামলাটি করেছিলেন। মামলায় জাবেদ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য আাসামিরা হলেন জাবেদের স্ত্রী ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান রুখমিলা জামান, ব্যাংকের পরিচালক ও জাবেদের ভাই আসিফুজ্জামান চৌধুরী জিমি, জাবেদের বোন রোকসানা জামান চৌধুরী ও ব্যাংকের সাবেক পরিচালক বশির আহমেদ।
সাবেক মন্ত্রী জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমিলার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির আদেশ : সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিদেশে থাকা ৫৮২টি ফ্ল্যাট ও বাড়ি হস্তান্তর ঠেকাতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ আদেশ দিয়েছে। গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. আবদুর রহমান এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোকাররম হোসাইন। সূত্রটি জানায়, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) থেকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পাচারের অভিযোগে করা একটি মামলায় দুদক গত ১৮ সেপ্টেম্বর আদালতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির আবেদনটি করেছিল।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকা পাচারের মামলা তদন্তে নেমে দুদক বিদেশে তাদের মালিকানাধীন ৫৮২টি ফ্ল্যাট ও বাড়ির তথ্য পায়। দেশ থেকে পাচার করা টাকায় তারা বিদেশে এসব সম্পদ গড়েছেন। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার মধ্যে জাবেদ ও তার স্ত্রী এসব ফ্ল্যাট-বাড়ি বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন বলে দুদক তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে। হস্তান্তর ঠেকাতে জাবেদ ও তার স্ত্রীর নামে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির আবেদন করা হয়।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) থেকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পাচারের অভিযোগে গত ২৪ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ে-১ একটি মামলা করেন। মামলায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানসহ ৩১ জনকে আসামি করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে তার বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর তাকে আর পরবর্তী সরকারে মন্ত্রী হিসেবে দেখা যায়নি।
