আজ মহাষষ্ঠীতে শুরু দুর্গোৎসব

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:১৪ এএম

দেবী দুর্গা এসেছেন মর্ত্যলোকে। গতকাল শনিবার শ্রীপঞ্চমীতে দেবীর বোধন (জাগ্রত) সম্পন্ন হওয়ার পর আজ রবিবার মহাষষ্ঠীতে তিনি আমন্ত্রিত ও পূজিত হবেন। গতকাল থেকে ঢাকের বোল, চণ্ডীপাঠ, মন্ত্রোচ্চারণ, কাঁসর-ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে পূজামণ্ডপগুলো। ষষ্ঠীতে দুর্গা দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস সম্পন্ন হবে। আজ সকালে বেলগাছ তলে (বিল্ববৃক্ষের নিচে) দেবীর আবাহন, সংকল্প এবং ‘ত্রিনয়নী’ দুর্গা দেবীর নিদ্রা ভাঙিয়ে পূজার্চনার মাধ্যমে তাকে বরণ করা হবে। এ বছর দেবী দুর্গা এসেছেন গজে (হাতি) চড়ে। গজে আগমনের অর্থ শান্তি, সমৃদ্ধি ও শস্য-শ্যামলার প্রতীক। পূজা শেষে দেবীর প্রস্থান হবে দোলায় (পালকি) চড়ে, যা মহামারী বা মড়কের ইঙ্গিত বহন করে। আগামীকাল মহাসপ্তমীর দিন থেকে শুরু হবে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।

এদিকে, শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাণীতে তিনি বলেন, ‘সব অশুভ, অন্যায় ও অন্ধকারকে পরাজিত করে শুভ চেতনার জয় হবে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথেদুর্গাপূজা উপলক্ষে সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করি।’

‘মহাচণ্ডী’র উল্লেখ অনুযায়ী, ত্রেতাযুগে ভগবান রামচন্দ্র রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। শক্তি বৃদ্ধির আশায় শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। এরপর তিনি যুদ্ধে জয়লাভ করে রাবণকে পরাজিত করে স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করেন। সেই থেকে প্রতিবছর শরৎকালে দুর্গোৎসব পালিত হয়ে আসছে। শাস্ত্রকারদের মতে, দেবী দুর্গা তার ভক্তদের দুঃখ, ভয়, শোক ও যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন।

গত ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিনে দেবীপক্ষ শুরু হয়। বিশুদ্ধ পঞ্জিকা অনুসারে, ১২ আশ্বিন (২৯ সেপ্টেম্বর) মহাসপ্তমী, ১৩ আশ্বিন (৩০ সেপ্টেম্বর) মহাষ্টমী, ১৪ আশ্বিন (১ অক্টোবর) মহানবমী এবং ১৫ আশ্বিন (২ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। দেবীর সঙ্গে এই কয়েক দিন পূজিত হবেন তার সন্তান গণেশ, লক্ষ্মী, কার্তিক ও সরস্বতী।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুসারে, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি স্থায়ী ও অস্থায়ী মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে পূজা হচ্ছে ২৫৮টি মণ্ডপে। গত বছরের তুলনায় এবার পূজার সংখ্যা এক হাজারের বেশি বেড়েছে। সন্ধ্যা থেকে আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মণ্ডপগুলো। এই কয়েক দিন মণ্ডপগুলোতে বিভিন্ন বয়সের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হবে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের মণ্ডপগুলোয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব, আনসার সদস্যদের পাশাপাশি আয়োজক সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক দল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মণ্ডপে পূজার্চনার পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা এবং বিজয়া দশমীতে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজারসহ বিভিন্ন মণ্ডপে দুর্গাপূজার ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা গেছে।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।

পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ৪৩০ প্লাটুন বিজিবি : দুর্গাপূজা উপলক্ষে সীমান্ত এলাকাসহ সারা দেশে ২ হাজার ৮৫৭টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ৪৩০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বিজিবি সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিজিবির নিরাপত্তাধীন ২ হাজার ৮৫৭টি মণ্ডপের মধ্যে সীমান্তের ৮ কিলোমিটার এবং পার্বত্য এলাকার ১৫টি মণ্ডপসহ ১ হাজার ৪১১টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এ ছাড়া আরও ১ হাজার ৪৪৬টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৪১টি, চট্টগ্রাম মহানগরী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় ৬৯৪টি এবং অন্যান্য স্থানে ৩১১টি মণ্ডপ রয়েছে। পূজা উপলক্ষে যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা প্রতিরোধে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং সীমান্ত এলাকায় বিশেষ টহল পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, সীমান্ত এলাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

দিনাজপুরের হাকিমপুর প্রতিনিধি জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বিজিবি। সীমান্তে বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনসহ পূজামণ্ডপে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ টহল পরিচালিত হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় চলাচলকারীদের ওপর সর্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া, সীমান্ত এলাকায় নির্বিঘেœ পূজা উদযাপনের জন্য পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তায় ২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তারা টহলের পাশাপাশি মন্দির পরিদর্শন করছে। উৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করছে তারা। দেশের সবচেয়ে নিকটতম সীমান্ত এলাকা হিলিতে ১৯টি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

জয়পুরহাট ২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর কাজী আসিফ মাহমুদ জানান, যাতে নির্বিঘেœ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন সম্পন্ন হয়, সেজন্য বিজিবি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত