২০২০-২১ সাল পর্যন্ত ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও, এরপর থেকে তা ক্রমাগত কমছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে বাজারে ইলিশের দাম বেশি রয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। গত সোমবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ইলিশের প্রাপ্যতা, মূল্য ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি আগামী ৪ অক্টোবর থেকে ২২ দিনের ইলিশ রক্ষা অভিযানের ঘোষণা দেন, যে সময়ে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুদ ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
ফরিদা আখতার বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছা থাকলেও এবার সাশ্রয়ী মূল্যে ইলিশ খাওয়ানো সম্ভব হয়নি। প্রাকৃতিক কারণে উৎপাদন কমেছে। এ জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। সদিচ্ছা থাকলেও সবকিছু বাস্তবায়ন করা যায়নি।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের জুনের মাঝামাঝি জাটকা ইলিশ আহরণের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর বাজারে ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়বে বলে আশা করা হয়েছিল, কিন্তু তা হয়নি। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জুলাই ও আগস্টে ইলিশ আহরণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ৩৩.২০ শতাংশ এবং ৪৭.৩১ শতাংশ কমেছে। এই দুই মাসে মোট ৩৫,৯৯৩.৫০ টন ইলিশ আহরিত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২২,৯৪১.৭৮ টন (৩৮.৯৩ শতাংশ) কম। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত ইলিশ আহরণ ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের মোট আহরণ ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ টন, কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ১২ হাজার ৮৫৮ টন হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিএফআরআই) জানায়, ২০২৪-২৫ সালে ইলিশ উৎপাদন ৫ লাখ ৩৮ হাজার থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৪৫ হাজার টন হতে পারে। তবে, হ্রাসের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে প্রকৃত উৎপাদন আরও কম হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সমুদ্র ও নদীতে ইলিশ উৎপাদন হ্রাসের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ইলিশের জীবনচক্রের জন্য সমুদ্র ও নদী উভয় পরিবেশ অপরিহার্য। পরিপক্ক মা ইলিশ সমুদ্র থেকে মোহনা হয়ে স্বাদু পানির নদীতে ডিম ছাড়তে প্রবেশ করে। ডিম ফুটে লার্ভা বড় হয়ে সমুদ্রে ফিরে যায় এবং পরিপক্কতা অর্জন করে। জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৮৫ শতাংশের বেশি আসে বরিশাল বিভাগ থেকে। ইলিশের টেকসই উৎপাদনের জন্য মেঘনা-তেঁতুলিয়া মোহনাসহ প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন পথ অক্ষুন্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোলা-নোয়াখালী ও ভোলা-পটুয়াখালীর মধ্যবর্তী মোহনা ইলিশের প্রধান প্রজনন ও মাইগ্রেশন পথ। তবে এই মোহনায় অসংখ্য চর ও ডুবোচর রয়েছে, যাদের অনেকের বয়স ২০-৩০ বছর। জোয়ারে এগুলো ৪-৫ হাত পানির নিচে থাকে এবং ভাটায় জেগে ওঠে, যা নদীর নাব্য ও প্রজনন পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। পলি জমার কারণে নদীর গভীরতা ০.৫ থেকে ৭৫ ফুট পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়, যা নাব্য সংকটের প্রমাণ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইলিশ আহরণের প্রধান বাধা অবৈধ জাল এবং স্থায়ী ফাঁদ জালের ব্যবহার। কারেন্ট জাল, মশারি জাল ও ফিক্সড ইঞ্জিনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জাটকা ধরা পড়ছে। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী এসব জাল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জেলা প্রশাসন, মৎস্য দপ্তর, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড যৌথ অভিযানে অবৈধ জাল ও জাটকা জব্দ করছে, তবু সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে ইলিশ আহরণ কমছে। অপরিকল্পিত বাঁধ, কালভার্ট-সেতু নির্মাণ, পলি জমা, নদীর নাব্য হ্রাস এবং জলজ পরিবেশদূষণ ইলিশ উৎপাদনের প্রধান প্রতিবন্ধক।
মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা : ৪ অক্টোবর থেকে ২২ দিন ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুদ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৫’-এর অংশ হিসেবে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যাতে মা ইলিশ নিরাপদে ডিম দিতে পারে। ফরিদা আখতার জানান, এই সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই অভিযানে ৩৭টি জেলার ১৬৫টি উপজেলার ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০ জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হবে, যার জন্য মোট ১৫,৫০৩.৫০ টন চাল প্রয়োজন। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নিষেধাজ্ঞায় ৫২.৫ শতাংশ মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে সক্ষম হয়েছে, ফলে ৪৪.২৫ হাজার কোটি জাটকা ইলিশ পরিবারে যুক্ত হয়েছে। এই জাটকা ভবিষ্যতে পরিপক্ক ইলিশে রূপান্তরিত হবে।
