টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার স্বল্পমহেড়া-জামুর্কী দুই কিলোমিটার কাঁচা সড়কের কারণে তিন উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরেও এই গ্রামীণ কাঁচা সড়ক পাকাকরণ না হওয়ায় মহেড়া ও জামুর্কী ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকারও পরিবর্তন হয়নি। বেহাল এই কাঁচা সড়কের কারণে বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলের আগে নির্মিত সড়কটি স্বাধীন বাংলাদেশে একবারের জন্যও সংস্কার বা উন্নয়নের আওতায় আসেনি। অথচ ব্রিটিশ আমলে ১৮৯০-এর দশকে নির্মিত মহেড়া জমিদার বাড়িতে ১৯৭২ সালে আঞ্চলিক পুলিশ প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বর্তমানে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) নামে পরিচিত।
মির্জাপুর, বাসাইল ও দেলদুয়ার উপজেলা থেকে পিটিসিতে যাতায়াতের একমাত্র পথ এই সড়ক। স্বাধীনতার পর থেকে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, স্থানীয় নেতারা শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু সড়কটির উন্নয়নের কোনো কাজ হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
মহেড়া জমিদার বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য। ১৮৯০-এর দশকে স্পেনের করডোভা শহরের আদলে নির্মিত এই জমিদার বাড়ির ভবনগুলোর নির্মাণশৈলী রোমান, মোগল ও সিন্ধু স্থাপত্যের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে এটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার এবং বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত জমিদার এস্টেট হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। এর অনিন্দ্য সৌন্দর্য ও বিশাল মহলগুলোর কারুকার্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। সারা দেশ থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ এই জমিদার বাড়ি দেখতে ভিড় করে। তবে, স্বল্পমহেড়া ও জামুর্কী সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে স্থানীয় ও দর্শনার্থীদের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে পিকনিক স্পটে পৌঁছাতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, কড়াইল, ভাতকুড়া, ছাওলিমহেড়া, আদাবাড়ি, জামুর্কী, গোড়ান, সাঁটিয়াচড়া, গনুটিয়া, ধল্লযা ও বানিয়ারা গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল।
বাসাইল, দেলদুয়ার ও মির্জাপুরের বাসিন্দারা এই সড়ক দিয়ে জামুর্কী হাট ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাতায়াত করে। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই সড়কের কারণে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া স্বল্পমহেড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাফিজিয়া মাদ্রাসা, এবতেদায়ী মাদ্রাসা, গবড়া গ্রামবাংলা টেকনিক্যাল কলেজ, মহেড়া আনন্দ উচ্চ বিদ্যালয়, ছাওয়ালী ভাতকুড়া আছম বেগম কুন্ডেশরী বালিকা বিদ্যালয়, জামুর্কী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামুর্কী নবাব স্যার আব্দুল গণি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, ডুবাইল জাগরণী সমাজ কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডুবাইল হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।
আধুনিক যুগেও কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে হওয়ায় এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, জনপ্রতিনিধিরা বারবার আশ্বাস দিলেও কথা রাখেননি। সামান্য বৃষ্টিতে সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা শিক্ষার্থী ও কৃষকদের কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তির কারণ হয়। ভ্যানচালক নরু মিয়া জানান, এই সড়ক দিয়ে তাদের প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। বর্ষায় সমস্যা আরও বেড়ে যায়। খালি গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় মানুষের সাহায্য ছাড়া চলাচল সম্ভব হয় না। আয়ের তুলনায় গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে দ্বিগুণ খরচ হয়। তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে এই সড়কের এই দুরবস্থা দেখে আসছেন। তাদের একমাত্র দাবি, সরকার দ্রুত এই সড়কটি পাকা করে দিক।’
স্টার একাডেমি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী গাজী ফাহিম ও অহেদ জানায়, তাদের স্কুলে প্রায় ৭০০-৮০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি স্কুল ও মাদ্রাসা রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। বর্ষা ও বৃষ্টির সময় সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে অন্য পথে পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে স্কুলে যেতে হয়, ফলে সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
জামুর্কী নবাব স্যার আব্দুল গণি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাদেক আলী মিয়া জানান, তিনি এই গ্রামের সন্তান এবং জন্ম থেকেই এই সড়কের কোনো উন্নয়ন দেখেননি। তিন উপজেলার মানুষ এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, কৃষি পণ্য পরিবহন ও শহরে যাতায়াতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। একটু বৃষ্টিতে হাঁটু পরিমাণ কাদা মাড়িয়ে চলতে হয়। এই কাঁচা সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসতে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, স্বল্পমহেড়া-জামুর্কী সড়কের দুই কিলোমিটার কাঁচা অংশ এলজিইডির আইডিভুক্ত করা হয়েছে। ডিপিবি কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং আশা করা যায়, শিগগিরই ডিপিবি প্রকল্পের মাধ্যমে সড়কটির পাকাকরণের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
