ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে ইউরোপজুড়ে একযোগে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্পেন, ইতালি, যুক্তরাজ্য, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে যুদ্ধ বন্ধ ও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে চার শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে, ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে সুইডিশ অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ইসরায়েল থেকে তুরস্কে ফেরা আটক হওয়া অধিকারকর্মীদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। অন্যদিকে, ট্রাম্পকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল রবিবার ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এক জনের মৃত্যু হয়েছে অনাহারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, গাজা থেকে প্রথম ধাপে সেনা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে ইসরায়েল। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বলছে, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালের বড় শহরগুলোয় শনিবার একযোগে এই বিক্ষোভ হয়। স্পেনের বার্সেলোনা ও মাদ্রিদে শনিবারের এই বিক্ষোভের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই। তবে ইসরায়েলি বাহিনী মানবিক সহায়তাবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামে আটকানোর পর রোম ও লিসবনে প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই অভিযানে ইসরায়েল ৪৫০ কর্মীকে আটক করেছে, যাদের মধ্যে ৪০ জনের বেশি স্প্যানিশ রয়েছেন। এমনকি বার্সেলোনার সাবেক মেয়রও আছেন তাদের মধ্যে।
ইতালিজুড়ে একদিনের সাধারণ ধর্মঘটে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। মূলত এটিই ছিল ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে দেশটির অন্যতম বৃহত্তম গণআন্দোলন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় স্পেনে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ছে। বার্সেলোনা সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ অংশ নেয়। শহরের প্রধান সড়ক পাসেইগ দে গ্রাসিয়া কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পরিবারসহ নানা বয়সের মানুষ অংশ নেন এই বিক্ষোভে। লন্ডনের পাশাপাশি রোমেও বড় বিক্ষোভ হয়েছে। তিনটি ফিলিস্তিনি সংগঠন, স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন ও শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে এ কর্মসূচি আয়োজন করে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন রাই জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা পোর্টা সান পাওলো থেকে মিছিল শুরু করে সান জিওভান্নিতে গিয়ে শেষ করেন। পুলিশ বলছে, সেখানে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে, লন্ডনে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সমর্থনে বিক্ষোভে অংশ নেয় হাজারো মানুষ। ম্যানচেস্টারের এক সিনাগগে বৃহস্পতিবারের প্রাণঘাতী হামলার পর পুলিশ বিক্ষোভ স্থগিতের অনুরোধ জানালেও আয়োজকরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। শনিবার লন্ডনের কেন্দ্রীয় এলাকার ওই বিক্ষোভ থেকে অন্তত ৪৪২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। দ্য গার্ডিয়ান তার প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ৫০০ বলে জানিয়েছে। মাটিতে বসে থাকা বিক্ষোভকারীরা যখন পোস্টারে সেøাগান লিখছিলেন, তখন পুলিশ তাদের সরিয়ে নিয়ে যায়।
এদিকে, ফিলিস্তিনের গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী ‘গ্লোবাল ফ্রিডম ফ্লোটিলা’ থেকে আটক সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গকে ইসরায়েলি বাহিনী নির্যাতন ও লাঞ্ছিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইসরায়েলের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে তুরস্কে ফেরা নৌবহরের একাধিক আন্তর্জাতিক কর্মী এই অভিযোগ করেন। তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে দাবি করেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নৌবহর থেকে আটক ১৩৭ কর্মীকে গত শনিবার ইস্তাম্বুলে ফেরত পাঠানো হয়েছে। মুক্তি পাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৩৬ জন তুরস্কের নাগরিক। বাকিরা যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, মালয়েশিয়া, কুয়েত, সুইজারল্যান্ড, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক। গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলার সদস্য ও তুর্কি সাংবাদিক এরসিন চেলিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তিনি নিজের চোখে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গ্রেটা থুনবার্গকে নির্যাতিত হতে দেখেছেন। তিনি দাবি করেন, গ্রেটাকে ‘মাটিতে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হয়’ এবং ‘ইসরায়েলি পতাকায় চুমু খেতে বাধ্য করা হয়’। ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে একই ধরনের অভিযোগ করেন মালয়েশিয়ার মানবাধিকারকর্মী হাজওয়ানি হেলমি ও যুক্তরাষ্ট্রের উইন্ডফিল্ড বিবার। তারা বলেন, থুনবার্গকে ধাক্কা দিয়ে তার গায়ে জোর করে ইসরায়েলি পতাকা মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। হাজওয়ানি হেলমি সাংবাদিকদের বলেন, ওরা আমাদের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, আটকের পর মানবাধিকারকর্মীদের খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধপত্র দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক উইন্ডফিল্ড বিবারের অভিযোগ, গ্রেটা থুনবার্গের সঙ্গে অত্যন্ত বাজে আচরণ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, একটি কক্ষে ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির প্রবেশ করার পর সেখানে গ্রেটাকে ধাক্কা মেরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। নৌবহরের অন্য কর্মীরাও তাদের সঙ্গে হওয়া গুরুতর দুর্ব্যবহারের বর্ণনা দিয়েছেন।
